ঢাকা ০৯:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম :
প্রবাসী কার্ডে মিলবে বিমান টিকিট, লাউঞ্জ ও ভূমি সেবায় বিশেষ সুবিধা ‎হোয়াটসঅ্যাপে আসছে ‘লিকুইড গ্লাস’ ডিজাইন, বদলাচ্ছে ব্যবহার অভিজ্ঞতা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত বাংলাদেশের এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামানো সম্ভব: আইনমন্ত্রী জামিন পেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী দিল্লিতে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ১১৮ পুলিশ সদস্য আহত; ৭০ ককরোচ গ্রেপ্তার সাইবার বুলিং দমনে আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করবে সরকার ‎সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সবুজ সংকেত ট্রাম্প প্রশাসনের ‎ মিত্র দলগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা, ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

বাগেরহাটে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, টিকে থাকতে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন শিল্পীরা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:২৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ মে ২০২৫
  • / 567

ছবি সংগৃহীত

 

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনধারা, রুচি ও প্রয়োজন। আধুনিকতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এমনই এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্প মৃৎশিল্প যা এক সময়ের জনপ্রিয়তা হারিয়ে প্লাস্টিক ও মেলামাইনের আধিপত্যে কোণঠাসা।

বাগেরহাট সদর উপজেলার তালেশ্বর ইউনিয়নের গাবরখালী গ্রামের কুমারপাড়ায় গেলে দেখা যায়, এখনও কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্প ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এক সময় কাঠের তৈরি চাকা থাকলেও এখন লোহার চাকায় ঘোরে কুমোরদের জীবনের চাকা। চাকার ওপর শিল্পীর দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, খেলনা, ফুলদানি ও নানা সৌখিন সামগ্রী।

আরও পড়ুন  বিপন্নপ্রায় নয়া ভাঙনি নদী খনন: পুনরুদ্ধারের আহ্বান, দুর্ভোগ হ্রাসের সম্ভাবনা

প্রবীণ মৃৎশিল্পী রবিন পাল বলেন, “এই কাজে নির্দিষ্ট ধরনের মাটি লাগে, যা এখন বরিশাল থেকে আনতে হয়। আগে কাছের নদীর চর থেকেই পাওয়া যেত, কিন্তু এখনকার মাটি দূষিত। আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতিও নেই, এখনও সনাতন পদ্ধতিতেই কাজ করতে হয়।”
তিনি জানান, “মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ করলেও লাভ থাকে মাত্র ৮ হাজার। দোকানদাররা আমাদের তৈরি জিনিস ১০ টাকায় কিনে ২০-৩০ টাকায় বিক্রি করেন। প্রকৃত শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।”

একসময় এই পেশায় ২০০টিরও বেশি পরিবার জড়িত থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ১৫টি পরিবার। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা বদলে নিয়েছেন।
বিএ পাস করা শিল্পী খগেন পাল বলেন, “চাকরির পেছনে না ছুটে মৃৎশিল্পকেই বেছে নিয়েছিলাম। এক সময় আমাদের পণ্য দেশের নানা জায়গায় নৌকায় করে যেত। এখন নিজের গ্রামেই চাহিদা নেই।”
তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎচালিত চাকা থাকলে কাজ সহজ হতো, নতুন প্রজন্মের আগ্রহও বাড়ত।

মৃৎশিল্পী দীপালী রানী পাল বলেন, “মাটির হাঁড়ির পানি ঠান্ডা থাকে, রান্নার স্বাদ আলাদা হয়। কিন্তু মানুষ এখন মেলামাইন ও প্লাস্টিকে অভ্যস্ত। এতে শুধু আমাদের পেশা নয়, মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “লাভ নেই বলে কেউ আর শিখতে চায় না। ১০-১৫ বছর পর হয়তো গ্রামেই আর কোনো মৃৎশিল্পী থাকবে না।”

তালেশ্বরের শেখর চন্দ্র পাল বলেন, “মেলায় গিয়ে পণ্য বিক্রি করি। ফুলদানি বা চায়ের কাপের মতো সৌখিন জিনিসে কিছুটা চাহিদা আছে, কিন্তু প্রচারের অভাবে বিক্রি হয় না। আমি ৩০ বছর ধরে এই পেশায়, কিন্তু ছেলেকে অন্য পেশায় দিতে চাই।”

তালেশ্বরের কমলা পাল জানান, “সরস্বতী ও দুর্গাপূজার সময় প্রতিমার অর্ডার বাড়ে, তখন ব্যস্ততা থাকে। বছরের বাকি সময় কাজ থাকে না, তাই অনেকে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।”
একসময় এই পেশায় জড়িত থাকা উজ্জ্বল পাল বলেন, “বেচাবিক্রি নেই বলে এখন অন্যের জমিতে কাজ করি।”

স্থানীয় শিক্ষক দীপক কুমার পাল বলেন, “মাটির পণ্য আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। এটি পরিবেশবান্ধব হলেও হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে।”

বাগেরহাট বিসিক কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, “আমরা চাইলে তালেশ্বরের মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ, ঋণ ও মার্কেটিং সহযোগিতা দিতে পারি। তাদের পাশে থাকতে বিসিক প্রস্তুত।”

এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিকীকরণ এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ। না হলে গ্রামবাংলার মাটি গড়া এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে চিরতরে।

নিউজটি শেয়ার করুন

বাগেরহাটে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, টিকে থাকতে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন শিল্পীরা

আপডেট সময় ১০:২৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ মে ২০২৫

 

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনধারা, রুচি ও প্রয়োজন। আধুনিকতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এমনই এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্প মৃৎশিল্প যা এক সময়ের জনপ্রিয়তা হারিয়ে প্লাস্টিক ও মেলামাইনের আধিপত্যে কোণঠাসা।

বাগেরহাট সদর উপজেলার তালেশ্বর ইউনিয়নের গাবরখালী গ্রামের কুমারপাড়ায় গেলে দেখা যায়, এখনও কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্প ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এক সময় কাঠের তৈরি চাকা থাকলেও এখন লোহার চাকায় ঘোরে কুমোরদের জীবনের চাকা। চাকার ওপর শিল্পীর দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, খেলনা, ফুলদানি ও নানা সৌখিন সামগ্রী।

আরও পড়ুন  বাগেরহাটে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

প্রবীণ মৃৎশিল্পী রবিন পাল বলেন, “এই কাজে নির্দিষ্ট ধরনের মাটি লাগে, যা এখন বরিশাল থেকে আনতে হয়। আগে কাছের নদীর চর থেকেই পাওয়া যেত, কিন্তু এখনকার মাটি দূষিত। আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতিও নেই, এখনও সনাতন পদ্ধতিতেই কাজ করতে হয়।”
তিনি জানান, “মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ করলেও লাভ থাকে মাত্র ৮ হাজার। দোকানদাররা আমাদের তৈরি জিনিস ১০ টাকায় কিনে ২০-৩০ টাকায় বিক্রি করেন। প্রকৃত শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।”

একসময় এই পেশায় ২০০টিরও বেশি পরিবার জড়িত থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ১৫টি পরিবার। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা বদলে নিয়েছেন।
বিএ পাস করা শিল্পী খগেন পাল বলেন, “চাকরির পেছনে না ছুটে মৃৎশিল্পকেই বেছে নিয়েছিলাম। এক সময় আমাদের পণ্য দেশের নানা জায়গায় নৌকায় করে যেত। এখন নিজের গ্রামেই চাহিদা নেই।”
তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎচালিত চাকা থাকলে কাজ সহজ হতো, নতুন প্রজন্মের আগ্রহও বাড়ত।

মৃৎশিল্পী দীপালী রানী পাল বলেন, “মাটির হাঁড়ির পানি ঠান্ডা থাকে, রান্নার স্বাদ আলাদা হয়। কিন্তু মানুষ এখন মেলামাইন ও প্লাস্টিকে অভ্যস্ত। এতে শুধু আমাদের পেশা নয়, মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “লাভ নেই বলে কেউ আর শিখতে চায় না। ১০-১৫ বছর পর হয়তো গ্রামেই আর কোনো মৃৎশিল্পী থাকবে না।”

তালেশ্বরের শেখর চন্দ্র পাল বলেন, “মেলায় গিয়ে পণ্য বিক্রি করি। ফুলদানি বা চায়ের কাপের মতো সৌখিন জিনিসে কিছুটা চাহিদা আছে, কিন্তু প্রচারের অভাবে বিক্রি হয় না। আমি ৩০ বছর ধরে এই পেশায়, কিন্তু ছেলেকে অন্য পেশায় দিতে চাই।”

তালেশ্বরের কমলা পাল জানান, “সরস্বতী ও দুর্গাপূজার সময় প্রতিমার অর্ডার বাড়ে, তখন ব্যস্ততা থাকে। বছরের বাকি সময় কাজ থাকে না, তাই অনেকে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।”
একসময় এই পেশায় জড়িত থাকা উজ্জ্বল পাল বলেন, “বেচাবিক্রি নেই বলে এখন অন্যের জমিতে কাজ করি।”

স্থানীয় শিক্ষক দীপক কুমার পাল বলেন, “মাটির পণ্য আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। এটি পরিবেশবান্ধব হলেও হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে।”

বাগেরহাট বিসিক কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, “আমরা চাইলে তালেশ্বরের মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ, ঋণ ও মার্কেটিং সহযোগিতা দিতে পারি। তাদের পাশে থাকতে বিসিক প্রস্তুত।”

এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিকীকরণ এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ। না হলে গ্রামবাংলার মাটি গড়া এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে চিরতরে।