ঢাকা ১১:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম :

নিজের সঙ্গেই সিয়ামের টক্কর: ‘রাক্ষস’ যখন নায়কনির্ভর বিনোদনের নতুন সমীকরণ

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০২:২৬:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • / 161

ছবি সংগৃহীত

বগুড়ার চেলোপাড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘মধুবন’ মাল্টিপ্লেক্সে বসে যখন ‘রাক্ষস’ সিনেমাটি শেষ হলো, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছাড়িয়েছে। সিয়াম আহমেদ অভিনীত এই সিনেমাটি নিয়ে ঈদের পর থেকে আলোচনা কিছুটা কম থাকলেও, বড় পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতা বলছে—এটি কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ছবি নয়, বরং সিয়ামের নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক ব্যক্তিগত লড়াই।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মধুবন হলটি আধুনিক সংস্কারের পর জেলা শহরের প্রেক্ষাপটে এক চমৎকার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের প্রায় ২০ দিন পর এবং স্থানীয় নির্বাচনের আগের রাতেও দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণত মফস্বলের সিঙ্গল স্ক্রিনে যে ধরনের হট্টগোল আশা করা যায়, মধুবনের পরিবেশ ছিল তার উল্টো—মার্জিত এবং সুশৃঙ্খল। পর্দায় যখন ‘রাক্ষস’ শুরু হলো, তখন বোঝা গেল কেন দর্শকরা পপকর্ন বা মোবাইল ছেড়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

সিনেমাটি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, এখানে গল্পের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন নায়ক নিজে। বর্তমান সময়ে যখন সিনেমার গল্পকে ‘আসল নায়ক’ বলা হয়, ‘রাক্ষস’-এ সেখানে চিত্রনাট্যের কিছু দুর্বলতা বা অযৌক্তিকতা খলনায়কের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সেই খামতিটুকু একাই সামলে নিয়েছেন সিয়াম আহমেদ।
‘পোড়ামন ২’-এর সেই রোমান্টিক তরুণ কিংবা ‘মৃধা বনাম মৃধা’র সেই আবেগপ্রবণ ছেলেটি থেকে সিয়াম এখন এক দুর্ধর্ষ অ্যাকশন অবতারে। নির্মমতা আর প্রেমের সংঘাতকে তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মনে হয় তিনি নিজের আগের কাজগুলোকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। এটি যেন পর্দার ভেতরে সিয়াম বনাম সিয়ামের এক মনস্তাত্ত্বিক টক্কর।

সহশিল্পীদের মধ্যে সোহেল মণ্ডল এবং আবরার আতহার চমৎকার সঙ্গ দিয়েছেন। বিশেষ করে নির্মাতা থেকে অভিনেতা হয়ে ওঠা আবরার আতহার নেতিবাচক চরিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছেন। কলকাতার সুস্মিতা চ্যাটার্জির অভিনয় ছিল সংযত, আর গানগুলোর মেজাজ সিনেমার অ্যাকশন ঘরানার সাথে এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করেছে। লোকেশন এবং কোরিওগ্রাফিও ছিল নজরকাড়া। তবে শ্যাম ভট্টাচার্য বা প্রবীণ অভিনেত্রী সুজাতার চরিত্রগুলো আরও কিছুটা গভীর হতে পারত।

আরও পড়ুন  শপথ নিয়ে দায়িত্ব নিল চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন কমিটি

অনেকেই এই সিনেমাকে দক্ষিণী ছবি বা বলিউডের ‘অ্যানিমেল’-এর সাথে তুলনা করছেন। তবে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ঘরানার এই মসলাদার ছবিতে যুক্তি খুঁজতে যাওয়াটা কিছুটা নিরর্থক।
দর্শক এখানে বিনোদন খুঁজতে এসেছেন এবং সিয়াম তাঁর পেশিবহুল শরীরী ভাষা ও সাবলীল অভিনয় দিয়ে সেই বিনোদনটুকু পূর্ণমাত্রায় দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেন এমন আচরণ করবেন বা নায়কের গায়ে কেন গুলি লাগবে না—এমন তাত্ত্বিক প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে হলের ভেতরে দর্শকদের মগ্নতা।

হল থেকে বের হওয়ার পর সাধারণ দর্শকদের চোখেমুখে তৃপ্তির আভা দেখা গেছে। কারও মাথায় ঘুরছে গল্পের শেষটা নিয়ে প্রশ্ন, কেউবা সিয়ামকে ‘কেজিএফ’ বা ‘জেলার’ ঘরানার সিনেমার জন্য প্রস্তুত হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বগুড়া শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে একটি নির্মম সত্যও সামনে এলো। একসময় যেখানে ১২টি সিনেমা হল ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা দুটি হল টিকে আছে।
ইন্টারনেট আর ওটিটির যুগেও মানুষ টাকা খরচ করে সিনেমা দেখতে চায়, কিন্তু সেই পরিবেশ বা ভালো মানের হল কোথায়? ‘রাক্ষস’ হয়তো ভালো ব্যবসা করবে, কিন্তু এই সিনেমাগুলো দেখানোর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে দেশের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক তৃষ্ণা মেটানো অসম্ভব। সিয়ামের এই একক লড়াই তাই শুধু অভিনয়ের গণ্ডিতে নয়, বরং সিনেমা হলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

নিজের সঙ্গেই সিয়ামের টক্কর: ‘রাক্ষস’ যখন নায়কনির্ভর বিনোদনের নতুন সমীকরণ

আপডেট সময় ০২:২৬:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

বগুড়ার চেলোপাড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘মধুবন’ মাল্টিপ্লেক্সে বসে যখন ‘রাক্ষস’ সিনেমাটি শেষ হলো, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছাড়িয়েছে। সিয়াম আহমেদ অভিনীত এই সিনেমাটি নিয়ে ঈদের পর থেকে আলোচনা কিছুটা কম থাকলেও, বড় পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতা বলছে—এটি কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ছবি নয়, বরং সিয়ামের নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক ব্যক্তিগত লড়াই।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মধুবন হলটি আধুনিক সংস্কারের পর জেলা শহরের প্রেক্ষাপটে এক চমৎকার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের প্রায় ২০ দিন পর এবং স্থানীয় নির্বাচনের আগের রাতেও দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণত মফস্বলের সিঙ্গল স্ক্রিনে যে ধরনের হট্টগোল আশা করা যায়, মধুবনের পরিবেশ ছিল তার উল্টো—মার্জিত এবং সুশৃঙ্খল। পর্দায় যখন ‘রাক্ষস’ শুরু হলো, তখন বোঝা গেল কেন দর্শকরা পপকর্ন বা মোবাইল ছেড়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

সিনেমাটি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, এখানে গল্পের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন নায়ক নিজে। বর্তমান সময়ে যখন সিনেমার গল্পকে ‘আসল নায়ক’ বলা হয়, ‘রাক্ষস’-এ সেখানে চিত্রনাট্যের কিছু দুর্বলতা বা অযৌক্তিকতা খলনায়কের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সেই খামতিটুকু একাই সামলে নিয়েছেন সিয়াম আহমেদ।
‘পোড়ামন ২’-এর সেই রোমান্টিক তরুণ কিংবা ‘মৃধা বনাম মৃধা’র সেই আবেগপ্রবণ ছেলেটি থেকে সিয়াম এখন এক দুর্ধর্ষ অ্যাকশন অবতারে। নির্মমতা আর প্রেমের সংঘাতকে তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মনে হয় তিনি নিজের আগের কাজগুলোকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। এটি যেন পর্দার ভেতরে সিয়াম বনাম সিয়ামের এক মনস্তাত্ত্বিক টক্কর।

সহশিল্পীদের মধ্যে সোহেল মণ্ডল এবং আবরার আতহার চমৎকার সঙ্গ দিয়েছেন। বিশেষ করে নির্মাতা থেকে অভিনেতা হয়ে ওঠা আবরার আতহার নেতিবাচক চরিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছেন। কলকাতার সুস্মিতা চ্যাটার্জির অভিনয় ছিল সংযত, আর গানগুলোর মেজাজ সিনেমার অ্যাকশন ঘরানার সাথে এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করেছে। লোকেশন এবং কোরিওগ্রাফিও ছিল নজরকাড়া। তবে শ্যাম ভট্টাচার্য বা প্রবীণ অভিনেত্রী সুজাতার চরিত্রগুলো আরও কিছুটা গভীর হতে পারত।

আরও পড়ুন  শপথ নিয়ে দায়িত্ব নিল চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন কমিটি

অনেকেই এই সিনেমাকে দক্ষিণী ছবি বা বলিউডের ‘অ্যানিমেল’-এর সাথে তুলনা করছেন। তবে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ঘরানার এই মসলাদার ছবিতে যুক্তি খুঁজতে যাওয়াটা কিছুটা নিরর্থক।
দর্শক এখানে বিনোদন খুঁজতে এসেছেন এবং সিয়াম তাঁর পেশিবহুল শরীরী ভাষা ও সাবলীল অভিনয় দিয়ে সেই বিনোদনটুকু পূর্ণমাত্রায় দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেন এমন আচরণ করবেন বা নায়কের গায়ে কেন গুলি লাগবে না—এমন তাত্ত্বিক প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে হলের ভেতরে দর্শকদের মগ্নতা।

হল থেকে বের হওয়ার পর সাধারণ দর্শকদের চোখেমুখে তৃপ্তির আভা দেখা গেছে। কারও মাথায় ঘুরছে গল্পের শেষটা নিয়ে প্রশ্ন, কেউবা সিয়ামকে ‘কেজিএফ’ বা ‘জেলার’ ঘরানার সিনেমার জন্য প্রস্তুত হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বগুড়া শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে একটি নির্মম সত্যও সামনে এলো। একসময় যেখানে ১২টি সিনেমা হল ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা দুটি হল টিকে আছে।
ইন্টারনেট আর ওটিটির যুগেও মানুষ টাকা খরচ করে সিনেমা দেখতে চায়, কিন্তু সেই পরিবেশ বা ভালো মানের হল কোথায়? ‘রাক্ষস’ হয়তো ভালো ব্যবসা করবে, কিন্তু এই সিনেমাগুলো দেখানোর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে দেশের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক তৃষ্ণা মেটানো অসম্ভব। সিয়ামের এই একক লড়াই তাই শুধু অভিনয়ের গণ্ডিতে নয়, বরং সিনেমা হলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।