ঢাকা ০২:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানে বিশেষ জোর

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০২:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
  • / 1

ছবি: সংগৃহীত

 

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বৃহস্পতিবার, ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটি প্রথম বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।

আরও পড়ুন  ২ জুন ঘোষণা আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট: গুরুত্ব পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি ও করনীতি

জাতীয় সংসদে বিকেল ৩টায় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্য সামনে রেখেই বাজেটের আকার বড় করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ।

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ মোট ১৩টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বিশেষভাবে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

উদ্যোক্তা উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে ২২৫ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৩ হাজার ২০ ডলার এবং অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির গতি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যার মাধ্যমে ব্যবসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুমোদন ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম আরও ডিজিটাল করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে অনলাইনে কর রিটার্ন জমা, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব থাকতে পারে।

এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে।

তবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে নেতিবাচক প্রবণতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত উৎস থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকিং খাত, ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি— এই চারটি ক্ষেত্র নতুন বাজেটের সফলতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভর্তুকির চাপ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং উন্নয়ন কর্মসূচির গতি বজায় রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

নিউজটি শেয়ার করুন

তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানে বিশেষ জোর

আপডেট সময় ০২:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

 

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বৃহস্পতিবার, ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটি প্রথম বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।

আরও পড়ুন  রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র

জাতীয় সংসদে বিকেল ৩টায় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্য সামনে রেখেই বাজেটের আকার বড় করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ।

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ মোট ১৩টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বিশেষভাবে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

উদ্যোক্তা উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে ২২৫ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৩ হাজার ২০ ডলার এবং অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির গতি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যার মাধ্যমে ব্যবসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুমোদন ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম আরও ডিজিটাল করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে অনলাইনে কর রিটার্ন জমা, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব থাকতে পারে।

এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে।

তবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে নেতিবাচক প্রবণতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত উৎস থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকিং খাত, ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি— এই চারটি ক্ষেত্র নতুন বাজেটের সফলতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভর্তুকির চাপ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং উন্নয়ন কর্মসূচির গতি বজায় রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।