ত্রৈমাসিক বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি গণসংহতির
- আপডেট সময় ০৫:৫০:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
- / 14
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনা করে তা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন (জিএসএ)। দলটির মতে, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে বাজেট বাস্তবায়নের গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে এবং সরকারের জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।
রোববার (১৪ জুন) রাজধানীর হাতিরপুলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল লিখিত ও মৌখিকভাবে বাজেট বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং সেই তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু। সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু। এতে দলের রাজনৈতিক পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি ও জাতীয় পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বিশ্লেষণে বলা হয়, ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয়েছে। বিশ্লেষণে বাজেটটিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারমুখী ও উচ্চাভিলাষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
গণসংহতির মূল্যায়নে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে বাজেটটি একটি রূপান্তরকালীন অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মধ্যে সরকার কাঠামোগত সংস্কার, সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতকে সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে। তবে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করা হয়।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও বিবিএসের সাময়িক হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
গণসংহতির বিশ্লেষণে বলা হয়, মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন টাকা। করহার অপরিবর্তিত রেখে করের আওতা বৃদ্ধি ও আদায় ব্যবস্থার দক্ষতার ওপর এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করা হয়।
শিক্ষা খাত নিয়ে বিশ্লেষণে বলা হয়, বরাদ্দের বড় অংশ বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে মত প্রকাশ করা হয়।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ পড়ার ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। কৃষি খাতে ভর্তুকিভিত্তিক বরাদ্দকে সহায়ক বলা হলেও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হয়।
অবকাঠামো উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে তুলনামূলক কম বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে বলা হয়, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলন বলেছে, প্রতি বছর প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং শেষ তিন মাসে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করার প্রবণতা প্রকল্পের মানকে প্রভাবিত করে। এ কারণেই তারা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দলটির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, বাজেটে ২ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ১ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়।
গণসংহতি আন্দোলনের মতে, বাজেটে ভোক্তা পর্যায়ে কিছু স্বস্তি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এর সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে রাজস্ব আদায়, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
দলটি খাদ্যবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। পাশাপাশি নারী উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
























