ঢাকা ০৭:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম :
জুলাই সনদ বিতর্কের ইতি টানার উচিত: মির্জা ফখরুলের ‎শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে ৫৮ নিহতের পরিচয় শনাক্ত: চিফ প্রসিকিউটর জিম্বাবুয়েকে ১৪৩ রানে থামাল বাংলাদেশ, লক্ষ্য ১৪৪ রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়াই দায়িত্ব পালনের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‎গণমাধ্যমের তোষামোদী সংস্কৃতি এখনো রয়ে গেছে— মির্জা ফখরুল ‎সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে টস হেরে বোলিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে দুই পরিবর্তন জুলাই বিপ্লবে বিএনপির ১৭ বছরের আন্দোলন সফল হয়েছে: রিজভী জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর নতুন দাবি তেহরানের সীতাকুণ্ডে যাত্রীবাহী বাস উল্টে নিহত ১, আহত ৬ ‘১৭ বছর মানুষকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

আফগানিস্তানে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানি বিমান হামলা: কেন এই নৃশংসতা?

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৯:১৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • / 85

ছবি সংগৃহীত

 

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ২৬৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া লাশের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা এই স্থানটি এখন আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৩ মে) জাতিসংঘ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বিশাল সংখ্যক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

হামলায় নিহত মিরওয়াইস (২৪) নামক এক যুবকের বোন মাসুদা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাঁর ভাইয়ের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, কেন এই নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করা হলো? তাঁর মতে, ভাইয়ের ধড়টুকু শনাক্ত করতে হয়েছে একটি জন্মদাগ দেখে। এমন অসংখ্য পরিবার এখনো তাঁদের প্রিয়জনের দেহাংশ খুঁজে ফিরছেন।

আরও পড়ুন  "ইরান চায় চীন-পাকিস্তান সিল্ক রোডে যুক্ত হতে: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান"

পাকিস্তান দাবি করেছে যে, তারা কোনো বেসামরিক স্থাপনা বা হাসপাতালে হামলা চালায়নি; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’। তবে ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী চিকিৎসক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে একটি ‘বেআইনি হামলা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে।

‘ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতাল’ নামক এই কেন্দ্রটি এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো বাহিনীর ব্যবহৃত ‘ক্যাম্প ফিনিক্স’ চত্বরে অবস্থিত ছিল। এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত স্থাপনা এবং জাতিসংঘের প্রধান কার্যালয় থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। স্থানীয়দের মতে, এখানে মূলত সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে যাওয়ার জন্য মাদকাসক্ত পুরুষরা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের প্রতিনিধি ফিওনা ফ্রেজার জানান, তাঁদের সংস্থাগুলো ওই হাসপাতালের রোগীদের সহায়তা দিয়ে আসছিল। ফলে এটি কোনো গোপন বা সামরিক আস্তানা হওয়ার সুযোগ নেই। ১৬ মার্চ রাতে তিনটি শক্তিশালী বোমা পুরো হাসপাতালটি ধ্বংস করে দেয় এবং কাঠের অবকাঠামো হওয়ায় সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যা অধিকাংশ রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেছেন, মাদকাসক্তদের সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তবে বিবিসি ৩০টিরও বেশি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এর কোনো সত্যতা পায়নি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছয় সন্তানের জনক আনোয়ারের মতো সাধারণ মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের কারণে আসক্তির শিকার হয়েছিলেন।

তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে যে তালেবানরা তাদের দেশে হামলাকারী টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। এই বাদানুবাদের জাঁতাকলে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ আফগান নাগরিকরা।

দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের পর আফগানরা যে শান্তির আশা করেছিল, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এই হামলা তা চুরমার করে দিয়েছে। বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে এক ভুক্তভোগীর ভাই আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এক নিপীড়িত জাতি, আমাদের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সৃষ্টিকর্তাই যেন এই অবিচারের বিচার করেন।”

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আফগানিস্তানে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানি বিমান হামলা: কেন এই নৃশংসতা?

আপডেট সময় ০৯:১৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

 

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ২৬৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া লাশের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা এই স্থানটি এখন আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৩ মে) জাতিসংঘ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বিশাল সংখ্যক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

হামলায় নিহত মিরওয়াইস (২৪) নামক এক যুবকের বোন মাসুদা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাঁর ভাইয়ের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, কেন এই নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করা হলো? তাঁর মতে, ভাইয়ের ধড়টুকু শনাক্ত করতে হয়েছে একটি জন্মদাগ দেখে। এমন অসংখ্য পরিবার এখনো তাঁদের প্রিয়জনের দেহাংশ খুঁজে ফিরছেন।

আরও পড়ুন  "ইরান চায় চীন-পাকিস্তান সিল্ক রোডে যুক্ত হতে: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান"

পাকিস্তান দাবি করেছে যে, তারা কোনো বেসামরিক স্থাপনা বা হাসপাতালে হামলা চালায়নি; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’। তবে ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী চিকিৎসক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে একটি ‘বেআইনি হামলা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে।

‘ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতাল’ নামক এই কেন্দ্রটি এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো বাহিনীর ব্যবহৃত ‘ক্যাম্প ফিনিক্স’ চত্বরে অবস্থিত ছিল। এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত স্থাপনা এবং জাতিসংঘের প্রধান কার্যালয় থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। স্থানীয়দের মতে, এখানে মূলত সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে যাওয়ার জন্য মাদকাসক্ত পুরুষরা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের প্রতিনিধি ফিওনা ফ্রেজার জানান, তাঁদের সংস্থাগুলো ওই হাসপাতালের রোগীদের সহায়তা দিয়ে আসছিল। ফলে এটি কোনো গোপন বা সামরিক আস্তানা হওয়ার সুযোগ নেই। ১৬ মার্চ রাতে তিনটি শক্তিশালী বোমা পুরো হাসপাতালটি ধ্বংস করে দেয় এবং কাঠের অবকাঠামো হওয়ায় সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যা অধিকাংশ রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেছেন, মাদকাসক্তদের সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তবে বিবিসি ৩০টিরও বেশি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এর কোনো সত্যতা পায়নি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছয় সন্তানের জনক আনোয়ারের মতো সাধারণ মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের কারণে আসক্তির শিকার হয়েছিলেন।

তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে যে তালেবানরা তাদের দেশে হামলাকারী টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। এই বাদানুবাদের জাঁতাকলে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ আফগান নাগরিকরা।

দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের পর আফগানরা যে শান্তির আশা করেছিল, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এই হামলা তা চুরমার করে দিয়েছে। বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে এক ভুক্তভোগীর ভাই আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এক নিপীড়িত জাতি, আমাদের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সৃষ্টিকর্তাই যেন এই অবিচারের বিচার করেন।”