ঢাকা ০২:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম :
বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ চলমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‎যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে সংলাপে ফেরার আহ্বান চীন ও পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন চাই, সংস্কারের কথা কখনও বলিনি: মির্জা ফখরুল ‎পুনর্বাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্যার্তদের পাশে থাকবে সরকার: অর্থমন্ত্রী ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনাকে গুনতে হতে পারে জরিমানা টানা ষষ্ঠ দিনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বনভোজন শেষে ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই শ্রমিকের মৃত্যু মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ট্রাম্পের বাংলাদেশকে শুভকামনা জানালেন আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক শাহজালালের মাজারে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লোপাট

শাহজালালের মাজারে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লোপাট

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:০১:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • / 25

ছবি সংগৃহীত

 

সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অপরাধ সিন্ডিকেট। যুগের পর যুগ ধরে চলা এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাজারের ডেক ও দানবাক্স থেকে নগদ টাকা আত্মসাৎ, মানতের পশু বারবার বিক্রি, কসাইবাণিজ্য, গিলাফ ও গোলাপজল জালিয়াতি এবং সুদের ব্যবসাসহ নানা উপায়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পূর্বে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও হিসাব না থাকায় দানের অর্থ সরাসরি প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এই লুটপাট বন্ধে এবং জনঅসন্তোষের মুখে সিলেটের জেলা প্রশাসন গত ১৮ জুন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের সামনে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে ২২ জুন ও ১১ জুলাই দুই দফায় এই দানবাক্স ও ডেকগুলো খুলে অর্থ গণনা করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে দানবাক্স থেকে নগদ ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে প্রথম দফায় ৪ দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯ দিনে ৪৭ লাখ ১০ Profit ১৫৩ টাকা পাওয়া যায়। এর বাইরে ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, ছাগল ও রহস্যময় চিরকুট উদ্ধার করা হয়।

তবে মাজারসংশ্লিষ্টরা জেলা প্রশাসনের এই কঠোর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন অপকৌশল অবলম্বন করেন; যার ফলে নারীদের দান করা বন্ধ করতে কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দেওয়ান নামধারী কেরানি জহুর উদ্দির রশীদ ভক্তদের কাছ থেকে দানবাক্সের বাইরে নগদ টাকা হাতে হাতে সংগ্রহ করেন। এই স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের পরপরই সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে বদলি হতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের মোতাওয়াল্লি ও খাদেমদের আয়ের মূল উৎস হচ্ছে মাজারের বিপুল সম্পত্তি এবং ডেক ও দানবাক্সের অর্থ। এর বাইরেও প্রবাসী ও দেশি ভিআইপিদের কাছ থেকে পাওয়া মোটা অঙ্কের ব্যক্তিগত নজরানা, স্বর্ণালংকার এবং বাৎসরিক ওরশের সময় সংগৃহীত বিপুল গবাদিপশু ও নগদ অর্থ তারা মাজারের তহবিলে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেন। এমনকি মাজারের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা দানবাক্সের টাকাও সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। মানতের পশুর ক্ষেত্রে চরম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কেরানি সামুন ও তার সহযোগীরা ভক্তদের দান করা একই গরু বা ছাগল সুকৌশলে নতুন করে অন্য ভক্তদের কাছে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করে।

এছাড়া মাজারের দৈনিক আয় নিয়ন্ত্রণকারী ৩০ জন মুরুব্বি খাদেমের এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সামুন ও খোকন ওরফে বকরি খোকন। প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টার নির্দিষ্ট ‘বারি’ বা ডিউটি থেকে প্রাপ্ত ৪-১০ লাখ টাকা তারা লুটে নেন এবং অর্থকষ্টে থাকা সাধারণ খাদেমদের চড়া সুদে টাকা ধার দিয়ে দাসত্বে বন্দি করে রাখেন।

মাজারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পরিবেশকে সম্পূর্ণ কলুষিত করে তুলেছে সামুন ও খোকন সিন্ডিকেটের বিশ্বস্ত চার অপরাধী— মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন। এদের নেতৃত্বে মাজার প্রাঙ্গণে পকেটমার, ছিনতাই ও জুতা চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যার আয়ের একটি বড় অংশ মূল হোতাদের কাছে চলে যায়। মাজারের ভেতরের সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে হেড বাবুর্চি সোহেল ও ফয়েজের নেতৃত্বে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় এবং উল্টো চুরির অপবাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।

এছাড়া মানতের পশু রান্নার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা (গরুতে ১০-১৮ হাজার টাকা) আদায় করা হয় এবং পশুর মাংস ও চামড়া ছাড়ানোর সময় কসাইরা জালিয়াতি করে গরুর তিন ভাগের এক ভাগ মাংসই গায়েব করে দেয়। একই সাথে, ভক্তদের ভক্তি নিয়ে আনা দামি গিলাফ ও গোলাপজল মাজার থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় সামনের দোকানে চড়া দামে বিক্রি করার জালিয়াতিও নিয়মিত ঘটছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ও অনিয়মের বিষয়ে সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন যে, মাজারের সামগ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, বর্তমানে কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত সম্ভব না হলেও তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং কমিশন গঠিত হলেই এর আইনগত অনুসন্ধান শুরু হবে। তবে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান মাজারের নিজস্ব শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি সক্রিয় থাকার দাবি করে প্রশাসনের সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সিলগালা করার এই একতরফা পদক্ষেপকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

শাহজালালের মাজারে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লোপাট

আপডেট সময় ১০:০১:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

 

সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অপরাধ সিন্ডিকেট। যুগের পর যুগ ধরে চলা এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাজারের ডেক ও দানবাক্স থেকে নগদ টাকা আত্মসাৎ, মানতের পশু বারবার বিক্রি, কসাইবাণিজ্য, গিলাফ ও গোলাপজল জালিয়াতি এবং সুদের ব্যবসাসহ নানা উপায়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পূর্বে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও হিসাব না থাকায় দানের অর্থ সরাসরি প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এই লুটপাট বন্ধে এবং জনঅসন্তোষের মুখে সিলেটের জেলা প্রশাসন গত ১৮ জুন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের সামনে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে ২২ জুন ও ১১ জুলাই দুই দফায় এই দানবাক্স ও ডেকগুলো খুলে অর্থ গণনা করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে দানবাক্স থেকে নগদ ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে প্রথম দফায় ৪ দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯ দিনে ৪৭ লাখ ১০ Profit ১৫৩ টাকা পাওয়া যায়। এর বাইরে ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, ছাগল ও রহস্যময় চিরকুট উদ্ধার করা হয়।

তবে মাজারসংশ্লিষ্টরা জেলা প্রশাসনের এই কঠোর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন অপকৌশল অবলম্বন করেন; যার ফলে নারীদের দান করা বন্ধ করতে কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দেওয়ান নামধারী কেরানি জহুর উদ্দির রশীদ ভক্তদের কাছ থেকে দানবাক্সের বাইরে নগদ টাকা হাতে হাতে সংগ্রহ করেন। এই স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের পরপরই সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে বদলি হতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের মোতাওয়াল্লি ও খাদেমদের আয়ের মূল উৎস হচ্ছে মাজারের বিপুল সম্পত্তি এবং ডেক ও দানবাক্সের অর্থ। এর বাইরেও প্রবাসী ও দেশি ভিআইপিদের কাছ থেকে পাওয়া মোটা অঙ্কের ব্যক্তিগত নজরানা, স্বর্ণালংকার এবং বাৎসরিক ওরশের সময় সংগৃহীত বিপুল গবাদিপশু ও নগদ অর্থ তারা মাজারের তহবিলে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেন। এমনকি মাজারের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা দানবাক্সের টাকাও সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। মানতের পশুর ক্ষেত্রে চরম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কেরানি সামুন ও তার সহযোগীরা ভক্তদের দান করা একই গরু বা ছাগল সুকৌশলে নতুন করে অন্য ভক্তদের কাছে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করে।

এছাড়া মাজারের দৈনিক আয় নিয়ন্ত্রণকারী ৩০ জন মুরুব্বি খাদেমের এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সামুন ও খোকন ওরফে বকরি খোকন। প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টার নির্দিষ্ট ‘বারি’ বা ডিউটি থেকে প্রাপ্ত ৪-১০ লাখ টাকা তারা লুটে নেন এবং অর্থকষ্টে থাকা সাধারণ খাদেমদের চড়া সুদে টাকা ধার দিয়ে দাসত্বে বন্দি করে রাখেন।

মাজারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পরিবেশকে সম্পূর্ণ কলুষিত করে তুলেছে সামুন ও খোকন সিন্ডিকেটের বিশ্বস্ত চার অপরাধী— মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন। এদের নেতৃত্বে মাজার প্রাঙ্গণে পকেটমার, ছিনতাই ও জুতা চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যার আয়ের একটি বড় অংশ মূল হোতাদের কাছে চলে যায়। মাজারের ভেতরের সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে হেড বাবুর্চি সোহেল ও ফয়েজের নেতৃত্বে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় এবং উল্টো চুরির অপবাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।

এছাড়া মানতের পশু রান্নার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা (গরুতে ১০-১৮ হাজার টাকা) আদায় করা হয় এবং পশুর মাংস ও চামড়া ছাড়ানোর সময় কসাইরা জালিয়াতি করে গরুর তিন ভাগের এক ভাগ মাংসই গায়েব করে দেয়। একই সাথে, ভক্তদের ভক্তি নিয়ে আনা দামি গিলাফ ও গোলাপজল মাজার থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় সামনের দোকানে চড়া দামে বিক্রি করার জালিয়াতিও নিয়মিত ঘটছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ও অনিয়মের বিষয়ে সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন যে, মাজারের সামগ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, বর্তমানে কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত সম্ভব না হলেও তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং কমিশন গঠিত হলেই এর আইনগত অনুসন্ধান শুরু হবে। তবে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান মাজারের নিজস্ব শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি সক্রিয় থাকার দাবি করে প্রশাসনের সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সিলগালা করার এই একতরফা পদক্ষেপকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।