শৈশবে বেশি স্ক্রিন ব্যবহারে দুর্বল হতে পারে স্মৃতিশক্তি
- আপডেট সময় ১১:৪৮:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 12
শৈশবেই সন্তানের হাতে মোবাইল ফোন বা স্ক্রিনজাতীয় ডিভাইস তুলে দেওয়ার প্রবণতা তাদের ভবিষ্যৎ পড়াশোনা এবং স্মৃতিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জন্মের প্রথম বছর এবং স্কুলজীবনের শুরুর দিকে যদি সে বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়, তাহলে বড় হওয়ার পর তার শিক্ষাগত ফলাফল ও কর্মস্মৃতিতে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে বলে গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে।
ফরাসি গবেষণা সংস্থা ইনসার্ম এবং সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক যৌথভাবে এই গবেষণা চালান, যাতে অংশগ্রহণ করে সিঙ্গাপুরের মোট ৫০২ জন শিশু। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল ওয়ার্ল্ড জার্নাল অব পেডিয়াট্রিকসে।
গবেষণায় বিভিন্ন বয়সে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন লক্ষ করে পরবর্তীতে তা তাদের শিক্ষাগত সাফল্য ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এখানে ছয়টি ভিন্ন সময়কালে শিশুদের স্ক্রিন-অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে—শুধু দৈনিক কত সময় স্ক্রিনে ব্যয় হচ্ছে তা নয়, বরং কোন বয়সে এই ব্যবহারের পরিমাণ বেশি, সেটিও ছিল গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এক বছর বয়সে অতিরিক্ত সময় স্ক্রিনে কাটানো শিশুদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে দুর্বল একাডেমিক ফলাফল এবং কর্মস্মৃতির সমস্যা লক্ষ করা গেছে। কর্মস্মৃতি বলতে বোঝানো হয় অল্প সময়ের জন্য কোনো তথ্য মনে রেখে প্রয়োজনে তা ব্যবহার করার দক্ষতাকে।
একইভাবে, প্রায় ছয় বছর বয়সেও অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতার সঙ্গে দুর্বল শিক্ষাগত পারফরম্যান্স ও স্মৃতিশক্তির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। তাদের মতে, শিশুর মানসিক বিকাশের এই সংবেদনশীল পর্যায়গুলোতে স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, স্ক্রিন ব্যবহারই সরাসরি শিশুর স্মৃতিশক্তি হ্রাসের কারণ—এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ তারা পাননি। বরং স্ক্রিনে কাটানো সময় এবং শিক্ষাগত-স্মৃতিগত ফলাফলের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্কের চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্ক্রিন সময় শিশুদের খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথন এবং সামাজিক মেলামেশার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। অথচ এই কাজগুলোই শিশুর ভাষাগত দক্ষতা, শেখার ক্ষমতা এবং সার্বিক মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে।
শিশুদের ভাষাগত বিকাশ নিয়েও অতীতের গবেষণায় একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছিল। ২০২০ সালে পরিচালিত ৪২টি ভিন্ন গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব শিশু বেশি সময় স্ক্রিনে ব্যয় করে, তাদের মধ্যে ভাষাগত দুর্বলতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। তবে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে মিলে স্ক্রিন দেখার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছিল সেই গবেষণায়।
পাশাপাশি, ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ছোট শিশুদের স্ক্রিন-আসক্তি এবং মনোযোগজনিত সমস্যার মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথাও উঠে আসে। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের ভবিষ্যতে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে।
গবেষকদের মতে, শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারকে একেবারে ভালো বা মন্দ—এই দুই ভাগে ফেলে বিচার করা ঠিক নয়। বরং শিশু কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কতক্ষণ ধরে দেখছে, কোন বয়সে দেখছে এবং সেই সময় বাবা-মা তার পাশে থেকে সম্পৃক্ত থাকছেন কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, বিশেষত শিশুর জীবনের প্রাথমিক বছরগুলোতে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সীমিত রাখার পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে মুখোমুখি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

























