টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডের ব্যর্থ চেষ্টা, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন
- আপডেট সময় ১১:৪১:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 28
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে দ্বিচারিতা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন আলজাজিরার কলামিস্ট বেলেন ফার্নান্দেজ। টেনেসিতে ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড নীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন তিনি।
লেখায় বেলেন ফার্নান্দেজ প্রথমে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যদি ১৮ বছর বয়সে করা অপরাধের জন্য ৫০ বছর বয়সী কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত, যিনি শৈশব থেকেই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার এবং মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিত কি না। তার মতে, এমন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রই সম্ভবত ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করত।
এরপর তিনি বলেন, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে একই ধরনের পটভূমির ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। গত বুধবার প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। তবে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পরও তিনি বেঁচে থাকায় কার্যক্রম বন্ধ করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পাইক টেনেসিতে ১৮২০ সালের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম নারী হওয়ার কথা ছিল। এর আগে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরিবর্তে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে তার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পাইকের আইনজীবীরা এই ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টাকে ‘রাসায়নিক নির্যাতন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে তার মস্তিষ্কে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেছেন কলামিস্ট।
ফার্নান্দেজ যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটির কথাও তুলে ধরেছেন। তার লেখায় ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা অন্তত ২০৩ জন পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন।
লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথার সময় মৃত্যুদণ্ড কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই বৈষম্যের প্রভাব এখনও রয়েছে বলেও মত দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ হলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ—এমন তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
পাইক কৃষ্ণাঙ্গ না হলেও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা সমাজের অনভিজাত শ্রেণীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন লেখক। তিনি এটিকে ‘পুঁজিবাদী শাস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কলামে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কর্মকর্তা জোনাথন রসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, রস জানুয়ারিতে মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে ৩৭ বছর বয়সী তিন সন্তানের মা রেনি গুডকে গুলি করে হত্যা করেন।
ফার্নান্দেজের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক কিংবা বিদেশে সামরিক অভিযান চালাক—এসব কর্মকাণ্ডকে বৈধতার কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে ইরান একই ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে সেটিকে নৈতিকভাবে জঘন্য ও অপরাধ হিসেবে দেখা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার পর টেনেসির কর্তৃপক্ষ বছরের বাকি সময়ের জন্য সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য উদ্ধৃত করে ফার্নান্দেজ লিখেছেন, টেনেসিতে যা-ই ঘটুক, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে কাউকে হত্যা করা ‘খুব কঠিন কিছু হওয়া উচিত নয়’ বলে মনে করেন তিনি।
কলামের শেষাংশে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দেশে ও বিদেশে প্রাণহানির কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার মধ্যে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি আদৌ এত সহজ হওয়া উচিত কি না।
লেখক পরিচিতি: বেলেন ফার্নান্দেজ একজন মার্কিন সাংবাদিক, লেখক ও আলজাজিরার কলামিস্ট। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও গণমাধ্যম-সমালোচনা তার লেখার প্রধান বিষয়।






















