জাতিসংঘে কালো চশমায় নজর কাড়লেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী
- আপডেট সময় ০৪:২৯:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 27
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর দেওয়া বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মঞ্চে তার স্বতন্ত্র কালো চশমা ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে থাকা দেশগুলোর প্রতি বিশ্বের ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছেন শাহ। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
কিছু গণমাধ্যম জলবায়ু ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আবার কয়েকটি প্রতিবেদনে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নেপাল, ভারত ও চীনকে নিয়ে আঞ্চলিক উদ্যোগ গড়ে তোলার শাহর প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শাহর বক্তব্যের চেয়ে তার উপস্থিতি ও কালো চশমা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেপালের নেতা কেন কালো সানগ্লাস পরেছিলেন?’—এমন শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জাতিসংঘে শাহর উপস্থিতির সঙ্গে নেপালে তার রাজনৈতিক ও জনপরিচিতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।
কালো চশমা, কালো স্যুট ও ঐতিহ্যবাহী নেপালি টুপি পরে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন শাহ। নিউইয়র্ক টাইমস তার কালো চশমাকে নেপালে জনপরিচিতির একটি অংশ হিসেবে উল্লেখ করে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৬ বছর বয়সী শাহ, যিনি দেশজুড়ে ‘বালেন’ নামে পরিচিত, জনসমক্ষে খুব কমই চশমা ছাড়া দেখা যায়।
কাঠমান্ডু পোস্টের জুলাই মাসের একটি প্রোফাইলের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সংবাদমাধ্যম ও বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকের সময় শাহ সাধারণত চশমা পরে থাকেন। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠক ও ব্যক্তিগত বৈঠকে তিনি তা খুলে রাখেন।
অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ান শাহর জাতিসংঘের বক্তব্যকে মূলত নেপালের বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বন্যাকে ‘বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা’ হিসেবে শাহর বর্ণনা এবং বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তার প্রশ্ন—তারা সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছেন কি না—বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
সাধারণ পরিষদে শাহ বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান এক-দশমাংশ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু সংকটের কারণে দেশটিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে গার্ডিয়ান জানায়, নেপাল এই সংকট সৃষ্টি করেনি, কিন্তু এর জন্য দেশটিকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
বন্যার পর নেপালের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে বলেও শাহ উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নেপাল, ভারত ও চীনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যায় সড়ক, সেতু, স্কুল, বাড়িঘর ও মানুষের জীবিকার উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেপালের উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার কয়েক সপ্তাহ পরও উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছিল এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ডলার জরুরি অর্থায়নের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দেয় বলে জানানো হয়।
কাতারভিত্তিক আল জাজিরাও শাহর বক্তব্যে বন্যা ও জলবায়ু সংকটের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে নেপালের বন্যাকে ‘বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা’ হিসেবে তুলে ধরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বানের কথা বলা হয়।
আল জাজিরা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করেছে। ওই গবেষণা অনুযায়ী, একটি মাত্র চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা নেপালের দুর্যোগের একমাত্র কারণ ছিল না; দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সমন্বিত প্রভাবও এতে ভূমিকা রেখেছে।
নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার চেয়েছে বলেও আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপালের সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।
জার্মানির ডয়চে ভেলে নেপাল ও হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। শাহর বক্তব্যের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি এর জন্য বড় ধরনের মূল্য দিচ্ছে।
পুনর্গঠনে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বানও শাহর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে বলে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ওপর নতুন করে ঋণের বোঝা চাপানো উচিত নয়—এমন অবস্থানের কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়।
ফ্রান্স ২৪-ও শাহর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি একা নেপালের পক্ষে এসব সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়—শাহর এমন বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
নেপাল, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গড়ে তোলার প্রস্তাবও গুরুত্ব পেয়েছে ফ্রান্স ২৪-এর প্রতিবেদনে। এর আওতায় স্যাটেলাইট তথ্য ভাগাভাগি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, আরব নিউজ ও দ্য কোরিয়া টাইমসও জলবায়ু সংকট ও শাহর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসের সংবাদ বুলেটিনেও নেপালের বন্যা, হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং শাহর কালো চশমার প্রসঙ্গ উঠে আসে।
সিঙ্গাপুরের দ্য স্ট্রেইটস টাইমস এএফপির প্রতিবেদন প্রকাশ করে দুর্যোগের ব্যাপকতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য নেপালের আবেদনকে গুরুত্ব দিয়েছে। সেখানে বন্যায় প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার চাওয়া এবং পুনর্গঠনে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজনের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার বিষয়ে আগে নেপালের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। ২৬ আগস্টের বন্যার পর শাহকে নেপালের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি জোরালো হয়। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর আগেই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার উদ্বোধনী বক্তব্যে নেপালের বন্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
সাধারণ পরিষদে বক্তব্যের শুরুতেই শাহ বলেন, ভোতেকোশি-ত্রিশূলি দুর্যোগ শুধু নেপালের স্থানীয় কোনো বিপর্যয় নয়, এটি বিশ্বের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। এরপর তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে জানতে চান, সেই সতর্কবার্তা তারা সত্যিই শুনেছেন কি না।
প্রায় তিন বছর আগে এভারেস্ট অঞ্চলে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসের সফরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শাহ। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেন।
শাহর বক্তব্যে নেপালের জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে বৈশ্বিক নিঃসরণের বৈষম্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম, অথচ পুনরুদ্ধারে দেশটির প্রয়োজন জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ।
শাহর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ নেতৃত্বে ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গঠন। এতে স্যাটেলাইট তথ্য ভাগাভাগি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
বক্তব্যে সরাসরি কোনো দেশকে দায়ী না করে শাহ বলেন, নেপাল কোনো দেশ বা মহাদেশকে দোষারোপ করতে সেখানে যায়নি। বরং ভারত ও চীনের বন্যা-পরবর্তী সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক জলবায়ু সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।
নেপালের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার কথাও জাতিসংঘের বক্তব্যে তুলে ধরেন শাহ। তিনি কৃষকদের সার, নির্মাণ খাতে বিটুমিন এবং পরিবারগুলোর রান্নার গ্যাসের সংকটের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও খাদ্যের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় সংকট দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে শাহর উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে। নিজের বক্তব্যে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পরিবর্তে জলবায়ু সংকট ও নেপালের পরিস্থিতিকে সামনে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। বক্তব্যের শেষাংশে নেপালি ভাষায় পশুপতিনাথ ও বুদ্ধের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘে শাহর বক্তব্যের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির বিষয়টিও সামনে এনেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে তার নীরবতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতারা এটিকে নীরবে কাজ করার প্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকেরা এটিকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে দেখেন।
ফলে জাতিসংঘে শাহর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক উপস্থিতিতে একদিকে নেপালের বন্যা, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দাবি আলোচনায় এসেছে; অন্যদিকে তার স্বতন্ত্র কালো চশমা ও জনপরিচিতির বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আলাদা করে জায়গা পেয়েছে।






















