মিলনের পর স্ত্রী খাদ্যে পরিণত হয় পুরুষ অক্টোপাস
- আপডেট সময় ০৮:০৬:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 46
ব্লু-লাইনড অক্টোপাসের প্রজনন আচরণ নিয়ে নতুন এক গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাসের খাদ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পুরুষ অক্টোপাস বিশেষ কৌশলে স্ত্রীকে সাময়িকভাবে অচেতন করে পালিয়ে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সামুদ্রিক প্রাণী অক্টোপাসের জীবনযাপন ও প্রজনন আচরণ দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস পুরুষ সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে। ডিম পাড়া ও সেগুলো পাহারা দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য স্ত্রী অক্টোপাস এমন আচরণ করে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ফ্যাবিও কোর্তেসি মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরের আইশা রাসকোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন।
কোর্তেসি জানান, মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস প্রায় ৪০ দিন পর ডিম পাড়ে। এরপর ডিম পাহারা দেওয়ার পুরো সময়ে তারা কোনো খাবার খায় না। ফলে ডিম পাড়ার আগেই পর্যাপ্ত খাবার খেয়ে শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হয় তাদের। এ সময় প্রচণ্ড ক্ষুধার কারণে তুলনামূলক ছোট পুরুষ অক্টোপাসকে শিকার করে খেয়ে ফেলে স্ত্রী।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পুরুষ ব্লু-লাইনড অক্টোপাস এই পরিণতি এড়ানোর একটি কার্যকর কৌশল তৈরি করেছে। তারা মিলনের সময় স্ত্রী অক্টোপাসের শরীরে টেট্রোডোটক্সিন বা টিটিএক্স নামের শক্তিশালী বিষ প্রয়োগ করে। অল্প পরিমাণ এই বিষ মানুষের জন্যও প্রাণঘাতী হতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মিলনের সময় পুরুষ অক্টোপাস স্ত্রীটির পিঠে উঠে যায়। এরপর প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে স্ত্রী অক্টোপাসের শরীরের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা এই অবস্থায় থাকার পর তার চেতনা ফিরে আসে।
চেতনা ফিরে পাওয়ার পর স্ত্রী অক্টোপাসটি আক্রমণাত্মক হয়ে পুরুষটিকে শরীর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ততক্ষণে পুরুষটি নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরুষ ব্লু-লাইনড অক্টোপাসের বিষগ্রন্থি স্ত্রী অক্টোপাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড়। একই ধরনের খাবার গ্রহণ করা সত্ত্বেও পুরুষের বিষগ্রন্থি এত বড় কেন—প্রথমে এ বিষয়টি গবেষকদের কাছে প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরে তারা ধারণা করেন, মূলত মিলনের সময় স্ত্রীকে বিষ প্রয়োগের জন্যই পুরুষের এই অতিরিক্ত বিষের প্রয়োজন হয়।
কোর্তেসি বলেন, প্রাণিজগতে টিটিএক্স ব্যবহার করে সঙ্গীকে অচেতন করার এমন ঘটনা প্রথমবারের মতো দেখা গেছে। অনেক অক্টোপাস প্রজাতিতে স্ত্রী পুরুষকে খাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে পুরুষ অক্টোপাসগুলো নিজেদের রক্ষা করতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে।
এর মধ্যে কিছু প্রজাতির পুরুষ মিলনের জন্য বিশেষ একটি বাহু ব্যবহার করে স্ত্রী থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখে। অক্টোপাসের আলাদা কোনো পুরুষাঙ্গ নেই; শুক্রাণু স্থানান্তরের জন্য বিশেষায়িত একটি বাহুই ব্যবহৃত হয়। কিছু প্রজাতিতে সেই বাহু বেশ লম্বা হওয়ায় স্ত্রীকে দূরে রেখেই মিলন সম্ভব হয়। তবে ব্লু-লাইনড অক্টোপাসের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে কামড় দিয়ে বিষ প্রয়োগ করাই প্রধান কৌশল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
কোর্তেসির ভাষ্য অনুযায়ী, এই কৌশল তারা অন্য প্রাণীর কাছ থেকে শেখে না। প্রজনন মৌসুম শেষ হলে স্ত্রী ডিম পাড়ে এবং মারা যায়; পুরুষও মারা যায়। ফলে পুরুষ অক্টোপাসের এই আচরণ মূলত অভিজ্ঞতা ও ভুলের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্ত্রী অক্টোপাস যখন পুরুষটির তুলনায় অনেক বড় হয়, তখন পুরুষটির খেয়ে ফেলার ঝুঁকিও বাড়ে। অথচ প্রজাতির বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে পুরুষকে মিলন করতেই হয়। সাধারণত পুরুষটি স্ত্রী অক্টোপাসের প্রধান ধমনীর কাছাকাছি কামড় দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে। লক্ষ্য ঠিক না হলে স্ত্রী দ্রুত জেগে উঠতে পারে এবং পুরুষটি মিলনের সময় এক বা দুটি বাহু হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
গবেষকরা জানান, টিটিএক্স অত্যন্ত শক্তিশালী একটি স্নায়ুবিষ, যা স্নায়ুর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। এর প্রভাবে দ্রুত হৃদযন্ত্র অচল হয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে। এ কারণে ভবিষ্যতে এই বিষের উপাদান ব্যবহার করে ব্যথানাশক ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা হতে পারে।
তবে স্ত্রী অক্টোপাস প্রায় এক ঘণ্টা অচেতন থাকার পরও মারা যায় না বলে জানান কোর্তেসি। গবেষণার সময় কোনো অক্টোপাসের মৃত্যু হয়নি। অক্টোপাস কীভাবে টিটিএক্সের প্রভাব কাটিয়ে এত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তার আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া গেলেও স্নায়ুতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে এই বিষ কীভাবে কাজ করে, তা এখনও গবেষণাধীন।

























