প্লাস্টিক বর্জ্য রূপান্তর করে প্রোটিনসমৃদ্ধ বিস্কুট বানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা
- আপডেট সময় ১১:২৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / 24
প্লাস্টিক বর্জ্যকে জৈব পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারে রূপান্তরের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন একদল বিজ্ঞানী। গবেষণার অংশ হিসেবে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে থ্রিডি প্রিন্টেড বিস্কুট তৈরি করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাদ্য সরবরাহের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।
সরাসরি প্লাস্টিক মানুষের জন্য বিষাক্ত হওয়ায় গবেষকেরা সেটিকে খাবারে রূপান্তরের আগে জটিল জৈব পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অন্যতম প্রধান ধরন পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি, যা কোমল পানীয় ও পানির বোতলসহ বিভিন্ন একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
গবেষকেরা পিইটি প্লাস্টিকের সঙ্গে ফেলে দেওয়া ভুট্টাগাছের কাণ্ড, পাতা ও অন্যান্য জৈব উপাদান মিশিয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি এবং অক্সিজেনের সাহায্যে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যান। এতে প্লাস্টিকসহ শক্ত উপাদানগুলো এমন ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে যায়, যা অণুজীব সহজে ব্যবহার করতে পারে।
এরপর ওই ভাঙা প্লাস্টিক যৌগের মধ্যে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট প্রয়োগ করা হয়। গবেষকদের তৈরি এসব অণুজীব প্লাস্টিকের উপজাত ব্যবহার করে প্রোটিন, চর্বি ও প্রয়োজনীয় শর্করায় সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ তৈরি করে।
পরবর্তী ধাপে ওই উপাদান পরিশোধন ও স্বাদযুক্ত করে থ্রিডি ফুড প্রিন্টারে দেওয়া হয়। প্রিন্টারটি স্তরে স্তরে পেস্ট বের করে বিস্কুটের মতো আকৃতি তৈরি করে। পরে সেটি বেক বা শক্ত করে খাবারের উপযোগী করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বনডেলের অণুজীববিজ্ঞানী ড. লাহিরু জয়াকোডি। তিনি জানান, তার গবেষণাগারে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। তার প্রশ্ন ছিল, প্লাস্টিক ও খাবার—দুটিই কার্বন দিয়ে তৈরি হলে প্লাস্টিককে খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার করা যাবে না কেন।
তবে গবেষণায় তৈরি বিস্কুট এখনো মানুষের খাওয়ার অনুমোদন পায়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকায় গবেষকেরাও এসব বিস্কুটের স্বাদ নেননি। তবে গন্ধের দিক থেকে বিস্কুটগুলো ভালো সাড়া পেয়েছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবারের ধারণা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া-আসার মতো দীর্ঘ অভিযানে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জয়াকোডির মতে, মঙ্গল অভিযানে যাওয়া ও ফিরে আসতে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে সঙ্গে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, সরঞ্জামের মোড়ক কিংবা অব্যবহৃত সামগ্রীকে খাবারের উপাদানে রূপান্তর করা গেলে মহাকাশে খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ কমতে পারে। গবেষকদের ধারণা, মহাকাশের পাশাপাশি সাবমেরিন ও দুর্যোগকবলিত এলাকাতেও এ ধরনের প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
জয়াকোডি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যতে ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এ পদ্ধতিতে তৈরি বিস্কুট উৎপাদনে প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ ডলার খরচ হচ্ছে। ফলে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মানবদেহের জন্য এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
সূত্র: এনডিটিভি

























