ঢাকা ০১:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
শিরোনাম :
নিউরোসায়েন্সেসে ৫০০ শয্যার ভবন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী সোনারগাঁয়ে ম্যারাথনে দৌড়ের সময় অসুস্থ হয়ে দৌড়বিদের মৃত্যু ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প দুপুরের মধ্যে ৭ জেলায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ২১৯ রানের লিড নিয়ে মধ্যাহ্নভোজে বাংলাদেশ নারী চিকিৎসকদের স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের নির্দেশনা, মুরাদনগর হাসপাতালে হাতে লেখা নোটিশ ঘিরে বিতর্ক গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা লোকসভা আসন নিয়ে মোদিকে বিজয়ের ৩ দাবি সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ, নিহত বেড়ে ৮

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৮:৪৩:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / 21

ছবি সংগৃহীত

 

১৫ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, কারাবরণ, রাজনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত শোক ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন তিনি। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্ব ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। একজন গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং পরে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। স্বামী হারানোর শোক, সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগ, রাজনৈতিক আন্দোলন, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।

আরও পড়ুন  তারেকের শপথে মোদীকে আমন্ত্রণের পরিকল্পনা বিএনপির: ডব্লিউআইওএন

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল পূর্বপরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। স্বামীকে হারানোর শোক এবং দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর ধীরে ধীরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নারী নেতৃত্বে পরিণত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনের সময় তিনি রাজপথে নেতৃত্ব দেন এবং বিভিন্ন সময়ে আটক হন।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারের হাতে তাঁকে আটক হতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই সময়ের আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সরকারের সময়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তিনি আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর সরকারের সময়ে শিক্ষা, নারী শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি এবং নারী ক্ষমতায়নের উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতির আলোচনায় জায়গা করে নেয়।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় দিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রশ্নেও তিনি বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট। এক-এগারোর সময় তাঁকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সে সময় তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা।’

ওই সময় তাঁকে এবং তাঁর দুই সন্তানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন বলে তাঁর রাজনৈতিক দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য তাঁর দুই সন্তানই বিদেশে যান।

ব্যক্তিগত জীবনেও একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকার সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই ঘটনাকে বিএনপি ও তাঁর পক্ষ থেকে অপমান ও অসম্মানের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এরপর ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যান। সন্তানের মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বড় আঘাত হয়ে আসে। রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতার পাশাপাশি এই শোকও তাঁকে বহন করতে হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দিকের অন্যতম কঠিন অধ্যায় ছিল কারাবাস ও অসুস্থতা। ২০১৮ সালে একটি মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কারাবাসের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পরও তাঁর চিকিৎসা চলতে থাকে এবং বিভিন্ন সময়ে মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।

শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তিনি সরে যাননি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সক্রিয়তা অব্যাহত ছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে বেগম খালেদা জিয়া পুরোপুরি মুক্তি পান। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব ও শর্তসাপেক্ষ মুক্তির অবসান ঘটে।

তবে দীর্ঘ কারাবাস, বয়স ও শারীরিক জটিলতায় তখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা ছিল নাজুক। ২০২৫ সালের শেষদিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়। ৩১ ডিসেম্বর তাঁর মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে নেওয়ার পর গুলশানের বাসভবন, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।

দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত এলাকায় মানুষের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। দেশের বিভিন্ন স্থানেও তাঁকে স্মরণ করে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ, স্ত্রী, মা, রাজনৈতিক নেত্রী এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর জীবনে যেমন রাজনৈতিক সাফল্য এসেছে, তেমনি ছিল পরাজয়, বিরোধিতা, কারাবাস, ব্যক্তিগত শোক ও নানা প্রতিকূলতা।

তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে সক্রিয় থাকা। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকট, সন্তানদের নিয়ে নানা প্রতিকূলতা, নিজের কারাবাস ও অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

১৫ আগস্ট তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাই বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের নানা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

আপডেট সময় ০৮:৪৩:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

 

১৫ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, কারাবরণ, রাজনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত শোক ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন তিনি। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্ব ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। একজন গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং পরে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। স্বামী হারানোর শোক, সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগ, রাজনৈতিক আন্দোলন, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।

আরও পড়ুন  তারেকের শপথে মোদীকে আমন্ত্রণের পরিকল্পনা বিএনপির: ডব্লিউআইওএন

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল পূর্বপরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। স্বামীকে হারানোর শোক এবং দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর ধীরে ধীরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নারী নেতৃত্বে পরিণত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনের সময় তিনি রাজপথে নেতৃত্ব দেন এবং বিভিন্ন সময়ে আটক হন।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারের হাতে তাঁকে আটক হতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই সময়ের আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সরকারের সময়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তিনি আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর সরকারের সময়ে শিক্ষা, নারী শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি এবং নারী ক্ষমতায়নের উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতির আলোচনায় জায়গা করে নেয়।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় দিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রশ্নেও তিনি বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট। এক-এগারোর সময় তাঁকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সে সময় তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা।’

ওই সময় তাঁকে এবং তাঁর দুই সন্তানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন বলে তাঁর রাজনৈতিক দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য তাঁর দুই সন্তানই বিদেশে যান।

ব্যক্তিগত জীবনেও একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকার সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই ঘটনাকে বিএনপি ও তাঁর পক্ষ থেকে অপমান ও অসম্মানের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এরপর ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যান। সন্তানের মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বড় আঘাত হয়ে আসে। রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতার পাশাপাশি এই শোকও তাঁকে বহন করতে হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দিকের অন্যতম কঠিন অধ্যায় ছিল কারাবাস ও অসুস্থতা। ২০১৮ সালে একটি মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কারাবাসের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পরও তাঁর চিকিৎসা চলতে থাকে এবং বিভিন্ন সময়ে মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।

শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তিনি সরে যাননি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সক্রিয়তা অব্যাহত ছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে বেগম খালেদা জিয়া পুরোপুরি মুক্তি পান। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব ও শর্তসাপেক্ষ মুক্তির অবসান ঘটে।

তবে দীর্ঘ কারাবাস, বয়স ও শারীরিক জটিলতায় তখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা ছিল নাজুক। ২০২৫ সালের শেষদিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়। ৩১ ডিসেম্বর তাঁর মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে নেওয়ার পর গুলশানের বাসভবন, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।

দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত এলাকায় মানুষের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। দেশের বিভিন্ন স্থানেও তাঁকে স্মরণ করে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ, স্ত্রী, মা, রাজনৈতিক নেত্রী এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর জীবনে যেমন রাজনৈতিক সাফল্য এসেছে, তেমনি ছিল পরাজয়, বিরোধিতা, কারাবাস, ব্যক্তিগত শোক ও নানা প্রতিকূলতা।

তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে সক্রিয় থাকা। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকট, সন্তানদের নিয়ে নানা প্রতিকূলতা, নিজের কারাবাস ও অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

১৫ আগস্ট তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাই বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের নানা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।