‘আর কোনো আয়নাঘর হবে না, গুম প্রতিরোধ দিবসে অঙ্গীকার রাষ্ট্রপতির
- আপডেট সময় ০৩:১৪:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / 18
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো গোপন বন্দিশালা বা “আয়নাঘর” থাকবে না এবং কোনো মা-বাবা কিংবা স্ত্রীকে প্রিয়জনের জন্য অশ্রু ঝরাতে হবে না।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে রাষ্ট্রপতি বলেন, দিনটি জাতির জন্য গভীর বেদনার এবং তিনি দেশে-বিদেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় কাটিয়েছেন—বিশেষত সেই সব সন্তান, যাদের শৈশব কেটেছে পিতার প্রত্যাবর্তনের আশায়—তাদের প্রতি তিনি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং গুমে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন।
রাষ্ট্রপতি গুমকে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং তার পরিবারের সুখ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকেও কেড়ে নেয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার যে নিশ্চয়তা দিয়েছে, গুমের মাধ্যমে তা সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘিত হয়।
বিগত সরকারের আমলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য গুম ও গোপন আটকের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছিল, অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বরাবরই এসব ঘটনা অস্বীকার করে এসেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আরও অনেকের নাম উল্লেখ করেন, যাদের পরিবার দীর্ঘদিন উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছে। ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ—লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী এমনকি সাধারণ গৃহবধূ পর্যন্ত—দীর্ঘদিন অন্ধকার বন্দিশালায় আটক ছিলেন বলেও তিনি জানান। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে বিদেশে ফেলে আসার ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন, জানান যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা এই ব্যক্তি ভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন, যদিও অনেকে আজও নিখোঁজ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে রাষ্ট্রপতি বলেন, যে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মত্যাগ করেছিলেন, সেই আদর্শের বিপরীতে গুম-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জাতীয় ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায়। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন, যিনি গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন একদিন এসবের বিচার বাংলাদেশেই হবে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই শাসনব্যবস্থার পতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধ নয়, প্রকৃত অপরাধীদের আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন মোট ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন এখনও নিখোঁজ বা মৃত। প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বেছে বেছে টার্গেট করার প্রবণতা উঠে এসেছে, যা ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার উদ্দেশ্যেই সংঘটিত হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে বিচারকাজ এগিয়ে চলছে। রাষ্ট্রপতির মতে, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়—ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না, এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, গুমের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে—তার ক্ষমতা যত বড়ই হোক—বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে রুদ্ধ করা হবে।






















