ঢাকা ০৮:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

ইসি নিরপেক্ষ ছিল, তবে সংস্কারের প্রয়োজন রয়ে: আনফ্রেল

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৭:২৯:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • / 74

ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল)। সংস্থাটি বলেছে, কমিশনের কার্যক্রমে আগের তুলনায় উন্নতি দৃশ্যমান হলেও নির্বাচন পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। বিশেষ করে জবাবদিহিতা, নির্বাচনী অর্থব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে আনফ্রেলের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আনফ্রেলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি, নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস, নির্বাচন বিশ্লেষক কার্লো আফ্রিকা এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর থারিন্দু আভেয়রাথনা। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ঋণ খেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আনফ্রেলের নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস বলেন, বিষয়টি তারা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করেননি। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়েছে এবং কমিশনের কার্যক্রমে উন্নতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের তা সমাধানের আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন  ইসির তফসিলে যুক্ত হচ্ছে আরও ৪৬টি প্রতীক, তফসিলে মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ১১৫

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি মন্তব্য করবেন না। তবে কমিশন কারও প্রতি কোনো ধরনের দয়া দেখায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন কমিশন একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কমিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের ধারণা হয়েছে, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসি প্রস্তুত রয়েছে।

আনফ্রেলের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি বড় সংকট হচ্ছে জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা। নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে জনআস্থা কম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে অর্থের প্রভাব ও অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী অর্থায়নের বিষয়টি উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় অতিরিক্ত ব্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং পোস্টার সংক্রান্ত বিধিমালার প্রয়োগে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। এতে কমিশনের নিজস্ব বিধি কার্যকর করার সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।

নির্বাচনের দিনে ভোটারদের ওপর অর্থের প্রভাবের আশঙ্কাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আনফ্রেলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু ভোটার ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সময় রাজনৈতিক দলের দেওয়া ভোটার স্লিপ পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রদর্শন করছিলেন। এটিকে ভোট কেনাবেচা বা প্রলোভনমূলক চুক্তি যাচাইয়ের একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হিসেবে উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচনপূর্ব সময় ও প্রচারণাকালে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ এবং পেশিশক্তির ব্যবহারের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া সামগ্রিকভাবে সুশৃঙ্খল ছিল বলে উল্লেখ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা সমানভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে জানিয়েছে আনফ্রেল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স খোলার সময় প্রয়োজনীয় যাচাইকরণ পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তবে এসব ঘটনায় ভোটের ফলাফল পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্র নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে দেওয়ায় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মত দিয়েছে আনফ্রেল।

সংস্থাটির মতে, নির্বাচন দিবসে ইতিবাচক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থাকে নিয়মভিত্তিক জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য নির্বাচনী ব্যয়ের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগ জানানোর স্পষ্ট ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতি বন্ধে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয় :

নিউজটি শেয়ার করুন

ইসি নিরপেক্ষ ছিল, তবে সংস্কারের প্রয়োজন রয়ে: আনফ্রেল

আপডেট সময় ০৭:২৯:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল)। সংস্থাটি বলেছে, কমিশনের কার্যক্রমে আগের তুলনায় উন্নতি দৃশ্যমান হলেও নির্বাচন পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। বিশেষ করে জবাবদিহিতা, নির্বাচনী অর্থব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে আনফ্রেলের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আনফ্রেলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি, নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস, নির্বাচন বিশ্লেষক কার্লো আফ্রিকা এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর থারিন্দু আভেয়রাথনা। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ঋণ খেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আনফ্রেলের নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস বলেন, বিষয়টি তারা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করেননি। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়েছে এবং কমিশনের কার্যক্রমে উন্নতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের তা সমাধানের আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন  ইসির তফসিলে যুক্ত হচ্ছে আরও ৪৬টি প্রতীক, তফসিলে মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ১১৫

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি মন্তব্য করবেন না। তবে কমিশন কারও প্রতি কোনো ধরনের দয়া দেখায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন কমিশন একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কমিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের ধারণা হয়েছে, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসি প্রস্তুত রয়েছে।

আনফ্রেলের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি বড় সংকট হচ্ছে জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা। নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে জনআস্থা কম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে অর্থের প্রভাব ও অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী অর্থায়নের বিষয়টি উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় অতিরিক্ত ব্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং পোস্টার সংক্রান্ত বিধিমালার প্রয়োগে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। এতে কমিশনের নিজস্ব বিধি কার্যকর করার সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।

নির্বাচনের দিনে ভোটারদের ওপর অর্থের প্রভাবের আশঙ্কাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আনফ্রেলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু ভোটার ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সময় রাজনৈতিক দলের দেওয়া ভোটার স্লিপ পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রদর্শন করছিলেন। এটিকে ভোট কেনাবেচা বা প্রলোভনমূলক চুক্তি যাচাইয়ের একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হিসেবে উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচনপূর্ব সময় ও প্রচারণাকালে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ এবং পেশিশক্তির ব্যবহারের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া সামগ্রিকভাবে সুশৃঙ্খল ছিল বলে উল্লেখ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা সমানভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে জানিয়েছে আনফ্রেল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স খোলার সময় প্রয়োজনীয় যাচাইকরণ পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তবে এসব ঘটনায় ভোটের ফলাফল পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্র নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে দেওয়ায় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মত দিয়েছে আনফ্রেল।

সংস্থাটির মতে, নির্বাচন দিবসে ইতিবাচক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থাকে নিয়মভিত্তিক জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য নির্বাচনী ব্যয়ের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগ জানানোর স্পষ্ট ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতি বন্ধে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।