ঢাকা ১২:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:২৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 37

ছবি সংগৃহীত

ভারতীয় সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে এই কিংবদন্তি অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার নিজের বাড়িতে হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা অনুভব করেন নানা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত চিকিৎসকদের খবর দিলে একটি চিকিৎসক দল তার বাসভবনে পৌঁছে চিকিৎসার চেষ্টা করে। তবে জ্ঞান না ফেরায় ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের সূত্র অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের একটি দল প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন  যুক্তরাষ্ট্রে অভিনেতা জোনাথন জসকে গুলি করে হত্যা

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী নানা পাটেকরের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে।

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। তবে রুপালি পর্দায় ‘নানা’ নামেই তিনি কোটি দর্শকের কাছে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন তিনি। এরপর কয়েক দশক ধরে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল কেবল তীব্র সংলাপ নয়; কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, স্থির ও গভীর দৃষ্টি, স্বতন্ত্র শরীরী ভাষা এবং সংলাপ বলার নিজস্ব ছন্দ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। এসব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তিনি কখনো ভয়ংকর, কখনো অসহায় আবার কখনো হাস্যরসাত্মক চরিত্রকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন।

‘পরিন্দা’ চলচ্চিত্রে আন্না চরিত্রে অভিনয় করে হিংস্রতা ও মানসিক অস্থিরতাকে অনন্যভাবে তুলে ধরেন নানা পাটেকর। এই অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান পান। পরে ‘ক্রান্তিবীর’ সিনেমায় প্রতাপনারায়ণ তিলকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রকাশ ঘটিয়ে সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতেও মানসিক ভারসাম্যহীন এক স্বামীর চরিত্রে তার অভিনয় প্রশংসিত হয় এবং জাতীয় স্বীকৃতি পায়। তবে রাগ, ক্ষোভ কিংবা কঠোর চরিত্রের বাইরেও নানা পাটেকরের আবেগঘন অভিনয়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ সিনেমায় বধির ও বাক্‌শক্তিহীন এক মেয়ের বাবার চরিত্রে তার অভিনয় ছিল তেমনই একটি উদাহরণ।

সিনেমাটিতে শক্তিশালী সংলাপের পরিবর্তে চোখের ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে মেয়ের প্রতি বাবার আবেগ ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। ‘আব তাক ছাপ্পান’-এ কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা সদু আগাশে এবং ‘ওয়েলকাম’-এ হাস্যরসাত্মক চরিত্র উদয় শেঠির ভূমিকাতেও নিজের বহুমাত্রিক অভিনয় প্রতিভার প্রমাণ দেন।

‘নটসম্রাট’ চলচ্চিত্রে গণপত বেলভালকরের চরিত্রে অভিনয় করে নানা পাটেকর তার অভিনয়জীবনের অন্যতম সেরা সাফল্য অর্জন করেন। ওই সিনেমায় অনেক সময় সংলাপের চেয়েও তার নীরবতা চরিত্রের আবেগকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছে। অহংকার থেকে অসহায়তায় একজন মানুষের পতনের অনুভূতি তার মুখের অভিব্যক্তি ও অভিনয়ে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় নানা পাটেকর শুধু বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেননি; রাগ, ক্ষত, অস্বস্তি, আবেগ ও অসহায়তার মতো মানবিক অনুভূতিগুলোকে নিজস্ব অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে পর্দায় শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন। তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই

আপডেট সময় ১০:২৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

ভারতীয় সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে এই কিংবদন্তি অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার নিজের বাড়িতে হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা অনুভব করেন নানা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত চিকিৎসকদের খবর দিলে একটি চিকিৎসক দল তার বাসভবনে পৌঁছে চিকিৎসার চেষ্টা করে। তবে জ্ঞান না ফেরায় ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের সূত্র অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের একটি দল প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন  বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা দিলদারের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী নানা পাটেকরের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে।

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। তবে রুপালি পর্দায় ‘নানা’ নামেই তিনি কোটি দর্শকের কাছে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন তিনি। এরপর কয়েক দশক ধরে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল কেবল তীব্র সংলাপ নয়; কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, স্থির ও গভীর দৃষ্টি, স্বতন্ত্র শরীরী ভাষা এবং সংলাপ বলার নিজস্ব ছন্দ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। এসব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তিনি কখনো ভয়ংকর, কখনো অসহায় আবার কখনো হাস্যরসাত্মক চরিত্রকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন।

‘পরিন্দা’ চলচ্চিত্রে আন্না চরিত্রে অভিনয় করে হিংস্রতা ও মানসিক অস্থিরতাকে অনন্যভাবে তুলে ধরেন নানা পাটেকর। এই অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান পান। পরে ‘ক্রান্তিবীর’ সিনেমায় প্রতাপনারায়ণ তিলকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রকাশ ঘটিয়ে সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতেও মানসিক ভারসাম্যহীন এক স্বামীর চরিত্রে তার অভিনয় প্রশংসিত হয় এবং জাতীয় স্বীকৃতি পায়। তবে রাগ, ক্ষোভ কিংবা কঠোর চরিত্রের বাইরেও নানা পাটেকরের আবেগঘন অভিনয়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ সিনেমায় বধির ও বাক্‌শক্তিহীন এক মেয়ের বাবার চরিত্রে তার অভিনয় ছিল তেমনই একটি উদাহরণ।

সিনেমাটিতে শক্তিশালী সংলাপের পরিবর্তে চোখের ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে মেয়ের প্রতি বাবার আবেগ ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। ‘আব তাক ছাপ্পান’-এ কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা সদু আগাশে এবং ‘ওয়েলকাম’-এ হাস্যরসাত্মক চরিত্র উদয় শেঠির ভূমিকাতেও নিজের বহুমাত্রিক অভিনয় প্রতিভার প্রমাণ দেন।

‘নটসম্রাট’ চলচ্চিত্রে গণপত বেলভালকরের চরিত্রে অভিনয় করে নানা পাটেকর তার অভিনয়জীবনের অন্যতম সেরা সাফল্য অর্জন করেন। ওই সিনেমায় অনেক সময় সংলাপের চেয়েও তার নীরবতা চরিত্রের আবেগকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছে। অহংকার থেকে অসহায়তায় একজন মানুষের পতনের অনুভূতি তার মুখের অভিব্যক্তি ও অভিনয়ে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় নানা পাটেকর শুধু বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেননি; রাগ, ক্ষত, অস্বস্তি, আবেগ ও অসহায়তার মতো মানবিক অনুভূতিগুলোকে নিজস্ব অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে পর্দায় শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন। তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবে।