শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে: দীনেশ ত্রিবেদী
- আপডেট সময় ০৩:৫৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 26
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। একই প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়েও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর একটি অধিবেশনে প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একাধিকবার দেশটির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বিষয়টি একটি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এর সঙ্গে আদালতও যুক্ত রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে পৌঁছেছিলেন, সে প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, তাঁকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সামরিক বিমানে করে ভারতে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, ওই সময় বাংলাদেশে যে মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অপ্রত্যাশিত। পৃথিবীর কোথাও যেন নিরপরাধ মানুষকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী জানান, সে সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে অবতরণ করে। ভারতও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। টেলিভিশনে তিনি দেখছিলেন, সংবাদে প্রচার করা হচ্ছিল শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। কিন্তু তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে ওই সময়ের বাস্তবতা গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। ভারত যদি শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাত বা তাঁর বহনকারী বিমানকে অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াত, তা বলা কঠিন।
হাইকমিশনারের ভাষায়, সেটিই ছিল ওই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর বর্তমানে প্রত্যর্পণের যে আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সেটি নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের বিচারব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের অবস্থান
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বোঝেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের কোনো প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার যেমন বাংলাদেশের রয়েছে, তেমনি ভারতেরও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে। ভালো প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল লেনদেনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করার আহ্বান জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি আরও বিস্তৃত। এর সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন জড়িয়ে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। এই বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক।
দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীতের কথা উল্লেখ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীত রচনা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা বাইরের বিশ্বের পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করা কঠিন।
নিরাপত্তা সহযোগিতা ও লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে উল্লেখ করে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বোঝেন। তাই ভবিষ্যতে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগ তৈরির মতো পরিস্থিতি আসবে বলে তিনি মনে করেন না।
মতপার্থক্য নিরসনে সংলাপের ওপর গুরুত্ব
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মতপার্থক্য বা সমস্যা থাকাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, একটি পরিবারের মধ্যেও কখনো সমস্যা ও মতবিরোধ দেখা দেয়। দুই দেশের সম্পর্কেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।
তবে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ ও পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দূরত্ব বজায় রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা রয়েছে, যা তিনি প্রত্যক্ষ করছেন। এ কারণে দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এখনো অটুট রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
























