মানচিত্রে নেই, বিমানও যায় না, তবু পর্যটকদের টানছে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া
- আপডেট সময় ১১:০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 38
স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘দ্য টার্মিনাল’ সিনেমায় জন্মভূমি হঠাৎ ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে যাওয়ায় বিমানবন্দরে আটকা পড়েছিলেন প্রধান চরিত্র। গল্পটি কাল্পনিক হলেও পূর্ব ইউরোপে বাস্তবেই রয়েছে এমন একটি অঞ্চল, যার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। মলদোভা ও ইউক্রেনের মাঝখানে অবস্থিত ট্রান্সনিস্ট্রিয়া নিজস্ব প্রশাসন, সেনাবাহিনী, মুদ্রা ও সীমান্তব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বীকৃত স্বাধীন দেশ নয়।
সরকারিভাবে অঞ্চলটির নাম ‘প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক’। সাধারণভাবে এটি ট্রান্সনিস্ট্রিয়া নামে পরিচিত। ১৯৯০ সালে মলদোভা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় অঞ্চলটি। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাতিসংঘের সদস্য কোনো রাষ্ট্র এটিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও বাস্তবে একটি রাষ্ট্রের মতোই এর নিজস্ব পতাকা, সংসদ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মুদ্রা ও ডাকটিকিট রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও এখানকার বিভিন্ন স্থাপনা, প্রতীক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় সেই সময়ের ছাপ স্পষ্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এখন পর্যটকদেরও আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠেছে। ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউবের ভ্রমণবিষয়ক ভিডিওতে অঞ্চলটির সোভিয়েত আমলের স্থাপত্য, লেনিনের মূর্তি, বাঙ্কার ও সংরক্ষিত প্রাচীরচিত্র তুলে ধরা হচ্ছে।
সোভিয়েত ধাঁচের বিশাল স্থাপনা ও পুরোনো বিভিন্ন নিদর্শনের কারণে কেউ কেউ অঞ্চলটিকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের খোলা জাদুঘর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের তালিকায় না থাকলেও পর্যটকদের আগ্রহে এর পরিচিতি বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২০ হাজার পর্যটক সেখানে যান। তাদের বড় একটি অংশ মলদোভা হয়ে অঞ্চলটিতে প্রবেশ করেন। পর্যটকদের এই আগ্রহকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ রুশ ও ইংরেজি ভাষায় ভ্রমণ নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নেই। অঞ্চলটির নিজস্ব বিমানবন্দর না থাকায় মলদোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে স্থানীয় মিনিবাস বা ‘মার্শরুটকা’ ব্যবহার করে তিরাসপোল কিংবা বেন্ডারে যেতে হয়।
প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসার প্রয়োজন না হলেও সীমান্ত চেকপয়েন্টে পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হয়। বিদেশি পর্যটকদের স্থানীয় সীমান্তরক্ষীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি সাময়িক প্রবেশপত্র দেন।
পর্যটকদের বর্ণনায়, ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় সোভিয়েত ঐতিহ্য ও ছোট শহরের শান্ত পরিবেশ পাশাপাশি দেখা যায়। রাজধানী তিরাসপোলের বিভিন্ন সড়কের নাম রুশ সেনা ও বিপ্লবীদের নামে। প্রধান সড়কের পাশে রয়েছে লেনিনের বড় মূর্তি এবং সোভিয়েত সেনাদের স্মরণে নির্মিত বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ। সরকারি ভবনেও এখনো দেখা যায় কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীক।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার ইতিহাসও সংঘাতপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ ইউক্রেন ও ওডেসা অঞ্চলের একটি অংশ বোঝাতে ‘ট্রান্সনিস্ট্রিয়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯২ সালে রোমানীয় ভাষাভাষী মলদোভার সঙ্গে রুশভাষী এই অঞ্চলের প্রায় চার মাসের সশস্ত্র সংঘাত হয়। এরপর অঞ্চলটি নিজেদের পৃথক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো করে।
মলদোভা এখনো পুরো অঞ্চলটির ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে। অন্যদিকে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার রুশভাষী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে। ২০০৬ সালের এক গণভোটে ৯৭ শতাংশ ভোটার রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার শর্তে স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় সাবেক সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির প্রভাব এবং অবৈধ অস্ত্রের আখড়া হিসেবে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার পরিচিতি ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের একটি ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশাপাশি অঞ্চলটির পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় ব্র্যান্ডি উৎপাদন।
কৃষ্ণসাগর ও দিনিস্টার নদীর কাছাকাছি উর্বর মাটি এবং নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য উপযোগী। স্থানীয় ব্র্যান্ডি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেভিন্ট’ বিভিন্ন ধরনের পানীয় উৎপাদন করে, যার মধ্যে ক্যাবারনেট সভিনঁসহ ২০টির বেশি স্বাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভ্রমণকারী ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রেডিটে প্রকাশিত ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় স্থানীয়দের আতিথেয়তা এবং তুলনামূলক কম জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথাও উঠে এসেছে। তবে এগুলো ভ্রমণকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মতামত।
সোভিয়েত আমলের আবহ থাকলেও অঞ্চলটির দৈনন্দিন জীবন থেমে নেই। তিরাসপোলের ক্যাফেগুলোতে আধুনিক রুশ গান শোনা যায়, আবাসিক ভবনের আশপাশে শিশুরা খেলাধুলা করে এবং স্থানীয় বাজারে ঘরে তৈরি ওয়াইন ও স্মোকড চিজ বিক্রি হয়।
বর্তমানে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার প্রশাসন নিজস্ব প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে অঞ্চলটি মস্কোর সামরিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওসেটিয়ার সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সোভিয়েত ঐতিহ্য, কম খরচের জীবনযাপন এবং সংঘাতপূর্ণ ইতিহাসের কারণে ট্রাভেল ভ্লগারদের কাছে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও পর্যটন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় অঞ্চলটি এখন পূর্ব ইউরোপের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।























