ঢাকা ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

দোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর নিয়ে প্রশ্ন

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:০৮:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
  • / 51

ছবি সংগৃহীত

 

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকায় এসেছিলেন—গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন দাবি প্রকাশিত হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং ভারতীয় প্রতিবেদনগুলোতে দোভালের উড়োজাহাজ, ঢাকায় অবস্থানের সময় এবং বাংলাদেশের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের যে তথ্য এসেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি নথিভুক্ত সময়সূচির অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ডেইলি ওয়াদা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দোভালের কথিত সফর নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য সামনে এলেও এসব দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

আরও পড়ুন  শীর্ষে ঢাকা: টানা তিনদিন ধরে বায়ু দূষণে উদ্বেগ

ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশে ছিলেন না। তিনি ১৬ সেপ্টেম্বর চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এবং ২০ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরেন।

এর মধ্যে ‘দ্য কাশ্মীর টাইমস’ ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে দোভালকে বহনকারী একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজ তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি যাতে প্রকাশ্যে শনাক্ত না হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দোভাল প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ও ডিজিএফআইপ্রধান কায়সার রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। কায়সার রশীদকে নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় একটি দক্ষিণ এশীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে দোভালকে বহনকারী কথিত উড়োজাহাজের যাত্রার নথি, বৈঠকের ছবি কিংবা সফর ও বৈঠকের পক্ষে অন্য কোনো প্রামাণ্য দলিল ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর রেডিফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর দোভাল ঢাকায় ছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।

তবে ওই প্রতিবেদনে দোভালের যাতায়াতের পথ, কোথায় তিনি অবতরণ করেছিলেন কিংবা বাংলাদেশের কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে তিনি জাপান সফর করেন। সেখানে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

১৯ সেপ্টেম্বর এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন সেনাপ্রধান। বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা দেখার পাশাপাশি অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

আইএসপিআর জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশে ফেরেন ওয়াকার-উজ-জামান।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান জাপানে অবস্থান করছিলেন। ফলে ওই দিন ঢাকায় এসে দোভালের সঙ্গে তার বৈঠকের যে দাবি ভারতীয় প্রতিবেদনে এসেছে, তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দোভালের কথিত বৈঠকের আরেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা কায়সার রশীদ চৌধুরীর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডেইলি ওয়াদা কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ডিজিএফআইপ্রধানও বাংলাদেশের বাইরে একটি উপসাগরীয় দেশে ছিলেন। তবে ওই দিনের তার আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নথি যাচাই করা হয়নি।

এ কারণে কায়সার রশীদ ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের বাইরে ছিলেন—এটি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ভারতীয় প্রতিবেদনের দাবি সত্য হলে, দোভালের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলা দুই বাংলাদেশি কর্মকর্তার কেউই ওই দিন ঢাকায় ছিলেন না।

দোভালের কথিত সফর নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেন, দোভালের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তার ভাষ্য, দোভাল বাংলাদেশে এলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি জানত এবং সেটি সরকারি সফর হতো।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে তিনি অনুমান ও গুঞ্জন হিসেবেও উল্লেখ করেন।

ভারতের পক্ষ থেকেও দোভালের কথিত সফর নিশ্চিত করা হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো নিশ্চিত তথ্য দেননি।

তবে সফরটি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি নতুন নয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান, সীমান্ত ইস্যু এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করেছে। তবে নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ফেব্রুয়ারিতে ডিজিএফআইপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর কায়সার রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার সঙ্গে দোভালের বৈঠকের কথা বলা হয়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানের সঙ্গেও তার বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এরপর গত আগস্টে ‘র’-এর প্রধান ঢাকায় সফর করেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ সফরের কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। একই দিনে মোদিও সেই শুভেচ্ছার জবাব দেন।

ভারতীয় কিছু প্রতিবেদনে এই প্রকাশ্য শুভেচ্ছা বিনিময়কে দোভালের কথিত ঢাকা সফরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ; এ বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য দেওয়া হয়নি।

দোভালের কথিত সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর ভারতীয় নাগরিক রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা করে পুলিশ।

পশ্চিমবঙ্গের ৪৪ বছর বয়সী রবিউলের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইনে মামলাটি করেন গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মেজবা উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহ তাকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠান। তদন্তকারীরা ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সন্দেহজনক চলাফেরার অভিযোগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় রবিউলকে প্রথমে আটক করা হয়। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে রবিউল বিভিন্ন সময়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন এবং ব্যবসাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত ছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সংরক্ষিত এলাকার ছবি, সরকারি নথি এবং সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।

তবে রবিউল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ব্যবসার কাজে তিনি নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন।

রবিউলের মামলার সঙ্গে দোভালের কথিত ঢাকা সফরের কোনো সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে একই সময়ের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর দোভালের কথিত ঢাকা সফর নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমে গোপন উড়োজাহাজ অবতরণ, প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থান এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি করা হলেও এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

দোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় ১০:০৮:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

 

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকায় এসেছিলেন—গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন দাবি প্রকাশিত হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং ভারতীয় প্রতিবেদনগুলোতে দোভালের উড়োজাহাজ, ঢাকায় অবস্থানের সময় এবং বাংলাদেশের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের যে তথ্য এসেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি নথিভুক্ত সময়সূচির অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ডেইলি ওয়াদা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দোভালের কথিত সফর নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য সামনে এলেও এসব দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

আরও পড়ুন  শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ঢাকায় শুরু ‘বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৫’

ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশে ছিলেন না। তিনি ১৬ সেপ্টেম্বর চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এবং ২০ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরেন।

এর মধ্যে ‘দ্য কাশ্মীর টাইমস’ ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে দোভালকে বহনকারী একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজ তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি যাতে প্রকাশ্যে শনাক্ত না হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দোভাল প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ও ডিজিএফআইপ্রধান কায়সার রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। কায়সার রশীদকে নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় একটি দক্ষিণ এশীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে দোভালকে বহনকারী কথিত উড়োজাহাজের যাত্রার নথি, বৈঠকের ছবি কিংবা সফর ও বৈঠকের পক্ষে অন্য কোনো প্রামাণ্য দলিল ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর রেডিফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর দোভাল ঢাকায় ছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।

তবে ওই প্রতিবেদনে দোভালের যাতায়াতের পথ, কোথায় তিনি অবতরণ করেছিলেন কিংবা বাংলাদেশের কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে তিনি জাপান সফর করেন। সেখানে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

১৯ সেপ্টেম্বর এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন সেনাপ্রধান। বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা দেখার পাশাপাশি অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।

আইএসপিআর জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশে ফেরেন ওয়াকার-উজ-জামান।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান জাপানে অবস্থান করছিলেন। ফলে ওই দিন ঢাকায় এসে দোভালের সঙ্গে তার বৈঠকের যে দাবি ভারতীয় প্রতিবেদনে এসেছে, তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দোভালের কথিত বৈঠকের আরেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা কায়সার রশীদ চৌধুরীর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডেইলি ওয়াদা কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ডিজিএফআইপ্রধানও বাংলাদেশের বাইরে একটি উপসাগরীয় দেশে ছিলেন। তবে ওই দিনের তার আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নথি যাচাই করা হয়নি।

এ কারণে কায়সার রশীদ ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের বাইরে ছিলেন—এটি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ভারতীয় প্রতিবেদনের দাবি সত্য হলে, দোভালের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলা দুই বাংলাদেশি কর্মকর্তার কেউই ওই দিন ঢাকায় ছিলেন না।

দোভালের কথিত সফর নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেন, দোভালের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তার ভাষ্য, দোভাল বাংলাদেশে এলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি জানত এবং সেটি সরকারি সফর হতো।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে তিনি অনুমান ও গুঞ্জন হিসেবেও উল্লেখ করেন।

ভারতের পক্ষ থেকেও দোভালের কথিত সফর নিশ্চিত করা হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো নিশ্চিত তথ্য দেননি।

তবে সফরটি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি নতুন নয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান, সীমান্ত ইস্যু এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করেছে। তবে নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ফেব্রুয়ারিতে ডিজিএফআইপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর কায়সার রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার সঙ্গে দোভালের বৈঠকের কথা বলা হয়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানের সঙ্গেও তার বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এরপর গত আগস্টে ‘র’-এর প্রধান ঢাকায় সফর করেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ সফরের কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। একই দিনে মোদিও সেই শুভেচ্ছার জবাব দেন।

ভারতীয় কিছু প্রতিবেদনে এই প্রকাশ্য শুভেচ্ছা বিনিময়কে দোভালের কথিত ঢাকা সফরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ; এ বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য দেওয়া হয়নি।

দোভালের কথিত সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর ভারতীয় নাগরিক রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা করে পুলিশ।

পশ্চিমবঙ্গের ৪৪ বছর বয়সী রবিউলের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইনে মামলাটি করেন গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মেজবা উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহ তাকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠান। তদন্তকারীরা ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সন্দেহজনক চলাফেরার অভিযোগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় রবিউলকে প্রথমে আটক করা হয়। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে রবিউল বিভিন্ন সময়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন এবং ব্যবসাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত ছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সংরক্ষিত এলাকার ছবি, সরকারি নথি এবং সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।

তবে রবিউল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ব্যবসার কাজে তিনি নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন।

রবিউলের মামলার সঙ্গে দোভালের কথিত ঢাকা সফরের কোনো সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে একই সময়ের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর দোভালের কথিত ঢাকা সফর নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমে গোপন উড়োজাহাজ অবতরণ, প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থান এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি করা হলেও এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।