ইরাকে বিজয় উদযাপন, সরকারি ছুটি ঘোষণা চার দিনের
- আপডেট সময় ১১:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 45
ইরাকে দীর্ঘ ২৩ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির অবসান ঘটেছে। মার্কিন সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিজয় উদ্যাপন। এ উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে ইরাক সরকার।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দেশটিতে দীর্ঘদিন অবস্থান করছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সেনাদের শেষ দলটি ইরাক ছাড়ে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। খবর রয়টার্স, আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট মনিটরের।
ইরাক সরকার এই দিনটিকে ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের শহীদ ও ভুক্তভোগীদের স্মরণে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। জাতীয় পতাকার রঙ ও দেশের মানচিত্রসংবলিত প্রতীকী ব্যাজ পরিধানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, মন্ত্রণালয় ও প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে দিবসটি উদ্যাপনের কর্মসূচি সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির সরকারের মতে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আব্দুল আমির আল-শাম্মারি জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে ভিক্টোরিয়া সামরিক ঘাঁটি মার্কিন সেনামুক্ত করা হয়েছে। ঘাঁটিটি পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।
ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের কোনো সেনা অবস্থান করছে না। তিনি বলেন, বিদেশি সেনাদের অনুপস্থিতিতেও দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষম ইরাকি বাহিনী।
২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ইরাকের একটি সমঝোতা হয়। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, দেশটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। গত বছর তাদের অধিকাংশকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে কুর্দি অধ্যুষিত কিছু এলাকায় অল্পসংখ্যক সেনা অবস্থান করছিলেন।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু হয়। ওই অভিযানে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে এক লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। পরে ২০১১ সালে মার্কিন সেনাদের একটি বড় অংশ ইরাক ছেড়ে যায়। তবে ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য আবারও দেশটিতে সেনা মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের জন্য নতুন যুগের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে দেশটির পুরো ভূখণ্ডে জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে। ইরাককে সব ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যও তুলে ধরেছে সরকার।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ইরাকের জনগণের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানে সমর্থনপুষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মার্কিন সেনাদের অনুপস্থিতিতে ইরাকের অভ্যন্তরে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইরাকে সক্রিয় ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটবে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর। তার মতে, দেশের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। মার্কিন সেনাদের চলে যাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া নিরাপত্তার শূন্যতা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে তাদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি মাসে ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া চলমান ইরান যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাক ত্যাগের ফলে কৌশলগতভাবে ইরান লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে ইরানের প্রভাবের বিপরীতে ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি। সেনা প্রত্যাহারের পর সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার। তবে এর পরবর্তী সময়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিয়ে ইরাকের জনগণ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।















