ডাক্তারদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ-পরীক্ষা কমাতে আসছে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা
- আপডেট সময় ০২:১৩:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
- / 14
স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে দেশে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসকদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হবে, যা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য নিরাপদ ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে প্রয়োজন হলে রোগী নিজেই যেকোনো সময় প্রেসক্রিপশন দেখতে বা ডাউনলোড করতে পারবেন।
এ ব্যবস্থার আওতায় স্বাস্থ্য বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা হবে। তারা চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রবণতা শনাক্ত করতে পারবেন। কোনো রোগীর অভিযোগ এলে তা দ্রুত যাচাইয়ের সুযোগও তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই ই-প্রেসক্রিপশন কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এটি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও জনগণের জন্য কার্যকর ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। প্রয়োজন হবে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের। পাশাপাশি চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও রোগীর নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালু করলেই হবে না; এর সঙ্গে জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা, ক্লিনিক্যাল অডিট, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা, যাতে রোগী সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, অতিরিক্ত ওষুধ ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমাতে চিকিৎসকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে সরকারের পক্ষে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, একজন রোগী একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে নতুন চিকিৎসক আগের চিকিৎসার তথ্য সহজেই দেখতে পারবেন। এতে একই পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন কমবে এবং রোগীর সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।
তবে তিনি পরামর্শ দেন, সারাদেশে একযোগে চালুর পরিবর্তে প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা উচিত। সফলতা ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নের পর ধাপে ধাপে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন কার্যকর করতে হলে হাসপাতালগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে। এজন্য কম্পিউটার, সার্ভার, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবলসহ ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
তিনি মনে করেন, শক্তিশালী ইন্টারনেট সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

























