৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট, শুক্রবার বঙ্গভবনে শপথ
- আপডেট সময় ১১:০০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
- / 46
১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর পেরিয়ে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হচ্ছে বৃহস্পতিবার। জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। ভোট শেষে সংসদকক্ষেই ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হওয়ায় এবারের ভোটকে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখছেন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বলেন, এটি ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে তারা এই জায়গায় এসেছেন।
একই সভা শেষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া দেশের মানুষ আবার প্রত্যক্ষ করবে। তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি হবে এবং গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনও বুধবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এবারের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এবারের ভোটের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য মনোনীত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তবে অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় নিজে ভোট দিতে পারবেন না।
বর্তমান সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনসহ সদস্য সংখ্যা ৩৪৯ জন। একটি আসনের গেজেট এখনও প্রকাশিত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই হিসাবে ৩৪৯টি ব্যালট থাকবে এবং ভোটগ্রহণের জন্য তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শেষে সংসদকক্ষেই গণনা করা হবে। ফলাফলও সেখানেই ঘোষণা করবেন সিইসি। এরপর একই দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির ২১০টি আসন রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে বিরোধী দলে রয়েছে এবং দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের আসন ৭৭টি। আনুপাতিক হারে বণ্টিত ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সদস্যসংখ্যা বিরোধী দলের তুলনায় বেশি। ফলে ভোটের সংখ্যার হিসাবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলেও সংসদ সদস্য হওয়ায় মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দিতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
এরপর পরবর্তী সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত তৈরি হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। আগের দৃষ্টান্তটিও বিএনপি সরকারের সময় হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সংসদ সদস্য হিসেবে বিদায়ী বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং দলের নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ধারণা দেন। পরে বক্তব্য দেন বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
বক্তব্যের শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুল। তিনি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। একই সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকলে বা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। দল তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তা রক্ষা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও জানান।
বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে তিনি সবার কাছে দোয়া চান। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মিনিটের বক্তব্যে মির্জা ফখরুল অন্তত চার-পাঁচবার কেঁদেছিলেন। এতে সভায় আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয় এবং প্রধানমন্ত্রীও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। বুধবার নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এই নির্বাচন হওয়ায় নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের এ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের অভিজ্ঞতা সীমিত।
তবে সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। পুরো প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ঘাটতি না থাকে, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সব অংশীজনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশন সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।
নির্বাচন আয়োজনের জন্য বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে না বলেও জানান সিইসি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যালট ছাপানো, কাগজপত্র, স্টেশনারিসহ কিছু আনুষঙ্গিক খরচ হবে। সংসদ ভবনে বৈঠক আয়োজনের ব্যয় সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে।
ভোটগ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সিইসি জানান, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোট গণনার সময়ও সরাসরি সম্প্রচার চালু থাকবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশনে ভোট গণনা থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে।
তবে ফল ঘোষণার সময় কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে না। ব্যালটে ভোটারের নাম ও প্রার্থীর নাম থাকবে বলে জানান সিইসি।
ভোটগ্রহণের সময় সংসদ অধিবেশন কক্ষে কোনো প্রচার চালানো যাবে না। তবে সংসদ ভবনের বাইরে প্রচার-প্রচারণার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে জানিয়েছেন সিইসি।




















