খোকা ছিলেন রাজপথের খাঁটি যোদ্ধা: মির্জা আব্বাস
- আপডেট সময় ১১:৪২:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
- / 16
প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকাকে রাজপথের একজন খাঁটি যোদ্ধা হিসেবে স্মরণ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ও ঝগড়া হলেও দিনশেষে বিএনপির আদর্শ এবং মানুষের জন্য তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর গোপীবাগে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে এসব কথা বলেন মির্জা আব্বাস।
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এবং ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনও বক্তব্য দেন। তাঁরা খোকার রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং ঢাকা মহানগরে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা স্মরণ করেন।
‘খোকা ছিলেন সহজ-সরল ও বড় মনের মানুষ’
সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে মির্জা আব্বাস বলেন, “খোকা ছিলেন রাজপথের একজন খাঁটি যোদ্ধা। তিনি কম হাসতেন, কিন্তু তাঁর কথাবার্তা ও আন্তরিকতা মানুষকে সহজেই কাছে টেনে নিত। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও বড় মনের মানুষ ছিলেন।”
নিজেদের শৈশব, কৈশোর ও রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, তিনি শাহজাহানপুরের বাসিন্দা ছিলেন, আর খোকার বাড়ি ছিল গোপীবাগে। এলাকার বাসিন্দা থেকে কখন যে তাঁরা পরস্পরের সঙ্গী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়ে উঠেছেন, তা বুঝতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন—বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন।
মির্জা আব্বাস বলেন, “খোকা এবং আমার জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে যদি লিখতে বসি, তবে আস্ত একটি বই হয়ে যাবে। রাজনীতিতে আমাদের মতপার্থক্য কিংবা ঝগড়াও হতো, কিন্তু দিনশেষে আমরা বিএনপির আদর্শ ও মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করেছি।”
রাজনীতির নানা পরিবর্তনের মধ্যেও একসঙ্গে পথচলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ সে আমাদের মাঝে নেই, সে থাকলে হয়ত বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও অনেক ভালো কিছু হতে পারত।”
খোকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, তাঁকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় পরিসরে স্মরণসভার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে তাঁর রাজনৈতিক অবদান ও জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে খোকার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানানো এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার আহ্বান জানান তিনি।
খোকা ও আব্বাসের নেতৃত্বে ঢাকায় বিএনপির ভিত্তি: আবদুস সালাম
ঢাকা মহানগরে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে মন্তব্য করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
তিনি বলেন, তাঁদের নেতৃত্বেই ঢাকা মহানগরে বিএনপিকে সুসংগঠিত করা হয়েছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলকে ক্ষমতায় নেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ দলটির পেছনে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে।
আবদুস সালামের ভাষ্য, সাদেক হোসেন খোকা শুধু ঢাকা মহানগর নয়, সারা বাংলাদেশের রাজনীতিতেই অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন এবং ঢাকার অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
খোকার জনপ্রিয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। খোকার মরদেহ ঢাকার বিমানবন্দরে আনার পর বিমানবন্দর থেকে পুরো সড়কজুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল। জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঢাকাবাসীর কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।
বিএনপিকে জনগণের দল উল্লেখ করে আবদুস সালাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দলের নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ এবং তাঁদের থানার নেতা কমিশনার বাদল সরদারের জানাজায় মানুষের উপস্থিতিও তা প্রমাণ করেছে।
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, হুমকি-ধমকি দিয়ে বিএনপিকে কিছু করা যাবে না। কেউ সামান্য ধাক্কায় দলটি পড়ে যাবে মনে করলে ভুল করবেন। বিএনপি জনগণের সঙ্গে রয়েছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে পাঁচ বছর অপেক্ষা করে পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নিতে হবে।
আবদুস সালাম আরও বলেন, সংসদে বিরোধিতা করতে হলে সংসদেই কথা বলতে হবে, রাজপথে অরাজকতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। গত কয়েক দিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। বিএনপি দলগতভাবে এখনো এর বিরুদ্ধে মাঠে নামেনি। তবে তারেক রহমানের পেছনে কোটি কোটি মানুষ ও লাখ লাখ নেতাকর্মী রয়েছেন।
দেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। আবদুস সালাম বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয় এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। গত ১৭ বছরে পর্যাপ্ত গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি। তবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন অপেক্ষা করলে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
খোকা যেভাবে ঢাকা মহানগরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, মির্জা আব্বাসসহ তাঁরাও সেভাবে মহানগরকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন বলে মন্তব্য করেন আবদুস সালাম। ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধ থেকে রাজনৈতিক সমস্যাগুলো রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলার প্রত্যয় জানান তিনি।
ঐক্যবদ্ধ থাকলে ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব: ইশরাক
শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে লড়েছেন, একইভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্র তাঁদের থামাতে পারবে না।
ইশরাক বলেন, তাঁর বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। তাঁর সন্তান হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অতীতেও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। ভবিষ্যতেও তাঁর নির্দেশনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করবেন।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ইশরাক বলেন, “একটি কুচক্রী মহল চেষ্টা করছে, আপনারা দেখেছেন বিগত কয়েক দিন ধরে যে শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করে একটা নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।”
তিনি বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে চেষ্টা করছেন, তা সফল করতে তাঁর হাত শক্তিশালী করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
ইশরাক বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, যেভাবে বিগত দিনে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে লড়াই করেছিলাম, তাহলে কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের রুখে দিতে পারবে না।”
বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দোয়া মাহফিলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ইশরাক বলেন, তাঁর বাবার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সবাই উপস্থিত হয়ে তাঁকে স্মরণ করেছেন। এ জন্য তিনি ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবীউল্লাহ নবী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক গোলাম মাওলা শাহীন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা। এ ছাড়া ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দলসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার রুহের মাগফিরাত এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।




















