ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজই শেষ দিন: নাছির
- আপডেট সময় ০১:৫০:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 25
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ দিনে ১৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলার স্মৃতি, সাফল্য-ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন নাছির উদ্দীন নাছির। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এটাই তার শেষ দিন। তবে পদ ছাড়লেও সংগঠন, আদর্শ ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিদায়ী বক্তব্যে নাছির বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসময়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে। এ সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। একসময় সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সুযোগ পাবেন, তখন তা ভাবেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, রাজনীতি শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সংকটে সহায়তা করা এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে থাকার দীর্ঘ যাত্রা।
২০২৪ সালের ১ মার্চ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরের সময়কে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন নাছির। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন বলে দাবি করেন নাছির। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি। আন্দোলনের সময় নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও স্মরণ করেন তিনি।
আন্দোলনের পর নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন নাছির। তিনি জানান, বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকেও ফেনীতে গিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি। এরপর তিনি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন এবং পরে ছাত্রদলের অন্য নেতারাও বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে যান।
দায়িত্ব পালনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ‘মব সংস্কৃতি’, বিভিন্ন প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির। এসব পরিস্থিতির মধ্যেও ছাত্রদলকে সক্রিয় রাখা, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা কঠিন ছিল বলে জানান তিনি।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে নাছির বলেন, তাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে এটিকে নিজের একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না তিনি; বরং ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কয়েকটি কমিটি সম্পন্ন করতে না পারা এবং বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ শেষ করতে না পারায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন নাছির। তিনি বলেন, পদ কোনো ব্যক্তির যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। যারা কোনো কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে ছাত্রদলের নেতৃত্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াকে নিজের দায়িত্বকালের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির। একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল তাকে ভাবিয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করেছেন বলে জানান। তবে পরাজয় থেকেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ছাত্রদল ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের সময়ে সহযোগিতার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল বকুলসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়নে নাছির স্বীকার করেন, সবকিছু নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হয়নি। ভুল, সীমাবদ্ধতা ও কিছু সিদ্ধান্তে ঘাটতি ছিল। তবে ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তার কখনো ছিল না বলে জানান তিনি।
পদ ছাড়লেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না উল্লেখ করে নাছির বলেন, পদ থেকে বিদায় নেওয়া গেলেও আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া যায় না। নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের ডাকে ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।
দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন নাছির। একই সঙ্গে রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততা ও কঠিন সময়গুলো নীরবে সহ্য করা পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং কার্যক্রম তুলে ধরা সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
সবশেষে নাছির বলেন, তিনি একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন, সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে বা দায়িত্বে দেখা হওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী এবং দেশ সুখী, সমৃদ্ধ ও সফল হোক—এমন আকাঙ্ক্ষার কথা জানান ছাত্রদলের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক।




















