রেকর্ড গরমে মাটির নিচেই ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু
- আপডেট সময় ০২:৫৫:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 21
দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড দাবদাহে কৃষি খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তীব্র গরমে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাটি থেকে তোলার আগেই জমির নিচে আলু নরম ও পচে যাচ্ছে। অনেক আলু দেখতে সেদ্ধ আলুর মতো হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য প্রদেশ গ্যাংওনের কৃষকেরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ আগেও স্বাভাবিক থাকা অনেক আলুর খেতে এখন ফসল তুলতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকার আলুচাষি লি সাং-হিয়ক এসবিএসকে বলেন, ৪০ বছর ধরে কৃষিকাজ করলেও এমন পরিস্থিতি তিনি আগে দেখেননি।
দাবদাহে শুধু আলু নয়, গ্যাংওনের কয়েক হাজার পিয়ং জমির বাঁধাকপিও নষ্ট হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকেরা ফসল তুলতে দেরি করেছিলেন। এর মধ্যেই অতিরিক্ত গরমে জমিতেই বাঁধাকপি পুড়ে ও পচে যায়। এতে কৃষকদের কয়েক কোটি কোরীয় ওনের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফলবাগানেও পড়েছে দাবদাহের প্রভাব। অতিরিক্ত সূর্যের তাপে আপেলের খোসায় ‘সানবার্ন’ দেখা দিচ্ছে এবং রোদে থাকা অংশ বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত গরমে পিচফল ফেটে যাচ্ছে। আপেলচাষি চন জং-থে জানান, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চুসক উৎসবের সময় সংগ্রহের উপযোগী হওয়ার কথা থাকলেও অনেক আপেলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে গেছে। পিচচাষি পার্ক ওয়ান-সন বলেন, দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে কাজ না করার সরকারি পরামর্শ থাকলেও ফসল পচে যাওয়ায় কৃষকদের মাঠে যেতে হচ্ছে।
তীব্র গরমে মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দাবদাহে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালন করা প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইয়াংসান শহরে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা রেকর্ড শুরু হওয়ার পর এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
দাবদাহের কারণে কৃষকেরাও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। আবার ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরে থাকার সরকারি পরামর্শ মেনে চলাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছেন, দেশের মানুষ আগে এমন আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়নি। তিনি জাতীয় সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের মতে, এ ধরনের চরম আবহাওয়া ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত সরকারি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মূলত মানুষের মৃত্যু ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতিকে কেন্দ্র করে। কৃষিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি। তবে কৃষকদের আশঙ্কা, ব্যাপক ফসলহানির কারণে এমনিতেই চড়া থাকা খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শরৎকালীন উৎসব চুসকের আগে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকেরা আগেই আলুকে তীব্র গরমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২০২৪ সালে Potato Research সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রীষ্মকালীন আলু চাষে তাপসহনশীল জাতের প্রয়োজন হতে পারে। বসন্তকালীন আলু তুলনামূলক আগে রোপণ করলেও কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এশিয়াজুড়ে বাড়তে থাকা চরম তাপপ্রবাহেরও একটি উদাহরণ। জাপানের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। হংকংয়ে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা সেখানে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সর্বোচ্চ। চীনের শিনচিয়াংয়ের একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে জুলাইয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জমির নিচে আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু দেশটির কৃষি খাতের সংকট নয়, এশিয়ায় দ্রুত তীব্রতর হয়ে ওঠা জলবায়ু ঝুঁকিরও একটি সতর্কসংকেত।



















