ঢাকা ১১:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম :
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাবনা, কিছু গ্রহ হতে পারে আরও উপযোগী ফুসফুসে ক্যান্সার, পোপ লিওর অস্ত্রোপচার স্বামীর জায়গায় ট্রাম্পের নাম বলে ভাইরাল হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সচিব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৩ অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তির সাক্ষাৎ অপারেশন ক্লিন হার্ট নিয়ে যা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডে অনিয়ম করলে ছাড় নয়: প্রতিমন্ত্রী তরুণদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে: মমতা সরকারি হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সমন্বিত নীতিমালা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দুই বাংলাদেশির লাশ ফেরাতে সৌদির সহায়তা চাইল বাংলাদেশ

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাবনা, কিছু গ্রহ হতে পারে আরও উপযোগী

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / 13

ছবি : সংগৃহীত

 

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে, যেগুলো প্রাণের বিকাশ ও টিকে থাকার জন্য পৃথিবীর চেয়েও বেশি উপযোগী। এসব গ্রহে উষ্ণ ও স্থিতিশীল জলবায়ু, প্রচুর পানি এবং প্রাণের বিবর্তনের জন্য কয়েক শ কোটি বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস’ বা অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে পরিচিত এসব জগৎ নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর চেয়ে সামান্য বড় কিছু গ্রহ—বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহ—প্রাণের জন্য আরও উপযোগী হতে পারে।

আরও পড়ুন  এক মিনিটের সিদ্ধান্তে বাঁচল ১,৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ

বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, যেসব গ্রহে প্রাণের উদ্ভব, বিকাশ ও টিকে থাকার পরিবেশ পৃথিবীর চেয়ে ভালো হতে পারে, সেগুলোকে সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ বলা হয়। এ ধরনের গ্রহ পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত হতে পারে। পাশাপাশি এগুলোর ভর হতে পারে পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ।

এসব গ্রহের অভিকর্ষ বল বেশি হওয়ায় ঘন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার সক্ষমতাও বেশি হতে পারে। এতে জলবায়ু তুলনামূলক উষ্ণ ও স্থিতিশীল থাকতে পারে। এ ছাড়া বড় লৌহকেন্দ্রের কারণে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, যা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে প্রাণকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে।

গবেষকদের ধারণা, এসব গ্রহে বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ ও দ্বীপ থাকতে পারে। প্রাণের বিকাশের জন্য এমন পরিবেশ বিশেষভাবে অনুকূল হতে পারে। পৃথিবীর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ ও অগভীর জলরাশিতে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিবেশ কোনো গ্রহের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকলে সেখানে আরও বেশি প্রজাতির প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে। তবে এসব ধারণা এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামে পরিচিত এক ধরনের বামন নক্ষত্র। এগুলো সূর্যের তুলনায় ছোট, শীতল ও কমলা রঙের। এসব নক্ষত্র নিজেদের জ্বালানি খুব ধীরে পোড়ায়। ফলে কয়েক শ কোটি নয়, বরং কয়েক হাজার কোটি বছর পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে আলো ছড়াতে পারে। এ ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের জন্য অনেক বেশি সময় পাওয়া সম্ভব।

জার্মানির বার্লিনের একটি গবেষণাগারে জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচ ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রের অনুকরণে কৃত্রিম আলো তৈরি করে পরীক্ষা চালান। ওই কমলা রঙের আলোয় তিনি বাগানে শাক চাষ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, কৃত্রিম সূর্যালোকের তুলনায় কমলা আলোয় উদ্ভিদগুলো দ্রুত বেড়েছে এবং বেশি লম্বা হয়েছে।

এ গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহেও সালোকসংশ্লেষণ কার্যকরভাবে ঘটতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ আলো ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে। বর্তমানে জার্মানির লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসে কর্মরত ভিলোভিচ দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান করতে গিয়ে এসব নক্ষত্রের আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

পৃথিবীর চেয়েও বাসযোগ্য গ্রহ থাকার ধারণাটি ২০১০-এর দশকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনায় আসে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং এ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের ধারণা, প্রাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশের উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীকেই একমাত্র মানদণ্ড ধরে নেওয়া উচিত নয়। ২০১৪ সালে তারা সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের ধারণা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের শুধু পৃথিবীর মতো দেখতে গ্রহ খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

পৃথিবীতে বিপুল বৈচিত্র্যের প্রাণ থাকলেও এখানে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকা বেশ কিছু সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী সূর্যের সামান্য কাছাকাছি থাকলেও এর সমুদ্র হয়তো বর্তমানের মতো তৈরি হতে পারত না। এ ছাড়া সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতাও পৃথিবীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি বছর পর উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ জটিল জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পৃথিবী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলো আরও দীর্ঘ সময় প্রাণের উপযোগী থাকতে পারে। কারণ, সূর্যের তুলনায় এসব নক্ষত্রের বিবর্তন অনেক ধীরগতিতে ঘটে। ফলে এসব গ্রহে প্রাণের বিকাশ ও বিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় পাওয়া যেতে পারে। এতে আরও জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণের উদ্ভবের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মতো জীবসহ সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে। কিছু গবেষক এমন গ্রহের কল্পনা করছেন, যেখানে অগভীর সমুদ্র, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ এবং প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর সামুদ্রিক পরিবেশ রয়েছে। তবে পৃথিবীর বাইরে এমন বাস্তুতন্ত্র থাকার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো গ্রহে প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকলেই সেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ কারণে গবেষকেরা এমন গ্রহ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যেখানে উপযুক্ত তাপমাত্রা, তরল পানি ও বায়ুমণ্ডল রয়েছে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে—এমন কোনো গ্যাস আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করতে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ (প্ল্যানেটারি ট্রানজিটস অ্যান্ড অসিলেশনস অব স্টারস) অভিযান ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ অভিযানের মাধ্যমে প্রাণের উপযোগী হতে পারে—এমন গ্রহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা বড় আকারের পাথুরে গ্রহও থাকতে পারে।

এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হেলারের ধারণা, এর মাধ্যমে প্রাণের জন্য সম্ভাবনাময় বেশ কয়েকটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তবে গ্রহ শনাক্ত করাই হবে অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ। এরপর সেগুলোর বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে, এমন গ্যাস রয়েছে কি না, তা জানতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ থেকে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে, ২০৪০-এর দশকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র। এই পর্যবেক্ষণযন্ত্র দূরবর্তী গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য লক্ষণ খোঁজার কাজে আরও উন্নত সক্ষমতা দিতে পারে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতের এসব মহাকাশ অভিযান পৃথিবীর চেয়েও প্রাণের জন্য বেশি উপযোগী গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের সম্ভাবনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব কতটা ব্যাপক? বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোনো কোনো গ্রহে জলবায়ু বেশি স্থিতিশীল হতে পারে, পরিবেশ প্রাণের জন্য আরও অনুকূল হতে পারে এবং বিবর্তনের জন্য পাওয়া যেতে পারে কয়েক শ কোটি বছর অতিরিক্ত সময়। এসব বৈশিষ্ট্য জটিল প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

ভিলোভিচও পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। বিশেষ করে যেসব গ্রহের পরিবেশ পৃথিবীর চেয়েও বেশি অনুকূল হতে পারে, সেগুলোতে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে তার আগ্রহ রয়েছে। তবে আপাতত এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, নিশ্চিত কোনো আবিষ্কার নয়।

পৃথিবীই এখন পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া একমাত্র গ্রহ। তবে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানগুলো হয়তো একদিন এই ধারণা বদলে দিতে পারে এবং বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরতে পারে প্রাণের জন্য আরও অনুকূল কোনো নতুন জগতের সন্ধান।

সূত্র: এনডিটিভি।

নিউজটি শেয়ার করুন

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাবনা, কিছু গ্রহ হতে পারে আরও উপযোগী

আপডেট সময় ১০:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

 

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে, যেগুলো প্রাণের বিকাশ ও টিকে থাকার জন্য পৃথিবীর চেয়েও বেশি উপযোগী। এসব গ্রহে উষ্ণ ও স্থিতিশীল জলবায়ু, প্রচুর পানি এবং প্রাণের বিবর্তনের জন্য কয়েক শ কোটি বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস’ বা অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে পরিচিত এসব জগৎ নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর চেয়ে সামান্য বড় কিছু গ্রহ—বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহ—প্রাণের জন্য আরও উপযোগী হতে পারে।

আরও পড়ুন  ওমানে প্রাণ হারানো ৪ ভাইয়ের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হচ্ছে আজ

বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, যেসব গ্রহে প্রাণের উদ্ভব, বিকাশ ও টিকে থাকার পরিবেশ পৃথিবীর চেয়ে ভালো হতে পারে, সেগুলোকে সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ বলা হয়। এ ধরনের গ্রহ পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত হতে পারে। পাশাপাশি এগুলোর ভর হতে পারে পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ।

এসব গ্রহের অভিকর্ষ বল বেশি হওয়ায় ঘন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার সক্ষমতাও বেশি হতে পারে। এতে জলবায়ু তুলনামূলক উষ্ণ ও স্থিতিশীল থাকতে পারে। এ ছাড়া বড় লৌহকেন্দ্রের কারণে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, যা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে প্রাণকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে।

গবেষকদের ধারণা, এসব গ্রহে বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ ও দ্বীপ থাকতে পারে। প্রাণের বিকাশের জন্য এমন পরিবেশ বিশেষভাবে অনুকূল হতে পারে। পৃথিবীর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ ও অগভীর জলরাশিতে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিবেশ কোনো গ্রহের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকলে সেখানে আরও বেশি প্রজাতির প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে। তবে এসব ধারণা এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামে পরিচিত এক ধরনের বামন নক্ষত্র। এগুলো সূর্যের তুলনায় ছোট, শীতল ও কমলা রঙের। এসব নক্ষত্র নিজেদের জ্বালানি খুব ধীরে পোড়ায়। ফলে কয়েক শ কোটি নয়, বরং কয়েক হাজার কোটি বছর পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে আলো ছড়াতে পারে। এ ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের জন্য অনেক বেশি সময় পাওয়া সম্ভব।

জার্মানির বার্লিনের একটি গবেষণাগারে জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচ ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রের অনুকরণে কৃত্রিম আলো তৈরি করে পরীক্ষা চালান। ওই কমলা রঙের আলোয় তিনি বাগানে শাক চাষ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, কৃত্রিম সূর্যালোকের তুলনায় কমলা আলোয় উদ্ভিদগুলো দ্রুত বেড়েছে এবং বেশি লম্বা হয়েছে।

এ গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহেও সালোকসংশ্লেষণ কার্যকরভাবে ঘটতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ আলো ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে। বর্তমানে জার্মানির লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসে কর্মরত ভিলোভিচ দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান করতে গিয়ে এসব নক্ষত্রের আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

পৃথিবীর চেয়েও বাসযোগ্য গ্রহ থাকার ধারণাটি ২০১০-এর দশকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনায় আসে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং এ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের ধারণা, প্রাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশের উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীকেই একমাত্র মানদণ্ড ধরে নেওয়া উচিত নয়। ২০১৪ সালে তারা সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের ধারণা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের শুধু পৃথিবীর মতো দেখতে গ্রহ খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

পৃথিবীতে বিপুল বৈচিত্র্যের প্রাণ থাকলেও এখানে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকা বেশ কিছু সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী সূর্যের সামান্য কাছাকাছি থাকলেও এর সমুদ্র হয়তো বর্তমানের মতো তৈরি হতে পারত না। এ ছাড়া সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতাও পৃথিবীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি বছর পর উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ জটিল জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পৃথিবী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলো আরও দীর্ঘ সময় প্রাণের উপযোগী থাকতে পারে। কারণ, সূর্যের তুলনায় এসব নক্ষত্রের বিবর্তন অনেক ধীরগতিতে ঘটে। ফলে এসব গ্রহে প্রাণের বিকাশ ও বিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় পাওয়া যেতে পারে। এতে আরও জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণের উদ্ভবের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মতো জীবসহ সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে। কিছু গবেষক এমন গ্রহের কল্পনা করছেন, যেখানে অগভীর সমুদ্র, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ এবং প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর সামুদ্রিক পরিবেশ রয়েছে। তবে পৃথিবীর বাইরে এমন বাস্তুতন্ত্র থাকার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো গ্রহে প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকলেই সেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ কারণে গবেষকেরা এমন গ্রহ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যেখানে উপযুক্ত তাপমাত্রা, তরল পানি ও বায়ুমণ্ডল রয়েছে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে—এমন কোনো গ্যাস আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করতে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ (প্ল্যানেটারি ট্রানজিটস অ্যান্ড অসিলেশনস অব স্টারস) অভিযান ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ অভিযানের মাধ্যমে প্রাণের উপযোগী হতে পারে—এমন গ্রহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা বড় আকারের পাথুরে গ্রহও থাকতে পারে।

এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হেলারের ধারণা, এর মাধ্যমে প্রাণের জন্য সম্ভাবনাময় বেশ কয়েকটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তবে গ্রহ শনাক্ত করাই হবে অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ। এরপর সেগুলোর বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে, এমন গ্যাস রয়েছে কি না, তা জানতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ থেকে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে, ২০৪০-এর দশকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র। এই পর্যবেক্ষণযন্ত্র দূরবর্তী গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য লক্ষণ খোঁজার কাজে আরও উন্নত সক্ষমতা দিতে পারে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতের এসব মহাকাশ অভিযান পৃথিবীর চেয়েও প্রাণের জন্য বেশি উপযোগী গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের সম্ভাবনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব কতটা ব্যাপক? বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোনো কোনো গ্রহে জলবায়ু বেশি স্থিতিশীল হতে পারে, পরিবেশ প্রাণের জন্য আরও অনুকূল হতে পারে এবং বিবর্তনের জন্য পাওয়া যেতে পারে কয়েক শ কোটি বছর অতিরিক্ত সময়। এসব বৈশিষ্ট্য জটিল প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

ভিলোভিচও পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। বিশেষ করে যেসব গ্রহের পরিবেশ পৃথিবীর চেয়েও বেশি অনুকূল হতে পারে, সেগুলোতে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে তার আগ্রহ রয়েছে। তবে আপাতত এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, নিশ্চিত কোনো আবিষ্কার নয়।

পৃথিবীই এখন পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া একমাত্র গ্রহ। তবে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানগুলো হয়তো একদিন এই ধারণা বদলে দিতে পারে এবং বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরতে পারে প্রাণের জন্য আরও অনুকূল কোনো নতুন জগতের সন্ধান।

সূত্র: এনডিটিভি।