ফ্রান্সে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে উত্তেজনা, আটক ২ হাজার
- আপডেট সময় ০৬:৪৮:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 30
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট, শিক্ষক ঘাটতি, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও দীর্ঘ ক্লাস সূচির প্রতিবাদে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। প্যারিসের আশপাশে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার (২ অক্টোবর) চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন শুরুর পর প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
প্যারিস, মার্সেই, নঁত, স্ট্রাসবার্গ, তুলুজ ও লিলসহ বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আন্তঃমন্ত্রণালয় সংকট বৈঠক করেছেন।
শুক্রবার দেশজুড়ে ৪০০টির কিছু বেশি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে। যেসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান সম্ভব হবে না, সেসব জায়গায় দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে প্যারিস অঞ্চলের কয়েকটি হাইস্কুলে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি স্কুল ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর দুরবস্থা নিয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু শিক্ষার্থীর আপত্তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমদিকে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নঁত ও রুয়াঁর কয়েকটি স্কুলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে একটি স্কুলের সামনে পেট্রল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষক আক্রান্ত হন বলে জানা গেছে।
স্ট্রাসবার্গে একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং তুলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন শহরে গণপরিবহন চলাচলও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন শুরুর পর প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। শুধু ১ অক্টোবরই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে আটক করা হয়।
সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১ অক্টোবরের সংঘর্ষে ৩০৫ জন পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য আহত হন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর ১৭০ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা খাতের ৬৫ জন কর্মীও আহত হয়েছেন।
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ বা এলএফআইয়ের কয়েকজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। দলটির আইনপ্রণেতা লুই বোয়ার্ড এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এলএফআই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনাও করেছে দলটি।
সাঁ-দেনির মেয়র ও এলএফআই নেতা বালি বাগায়োকোর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আগুনের পাশে তাকে উল্লাস করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ১-এর ফ্যাক্ট-চেক এবং ল্য পারিজিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচারিত ভিডিওটি খণ্ডিত। পূর্ণ দৃশ্যে বাগায়োকোকে আগুন লাগাতে দেখা যায়নি। বরং তার পক্ষ থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বাগায়োকোর কিছু বক্তব্য নিয়েও আলাদা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর একটি অবরুদ্ধ হাইস্কুলের সামনে পুলিশের আচরণ প্রসঙ্গে তিনি ‘সহিংসতা বৈধ হতে পারে’—এমন মন্তব্য করেন। পরে তিনি ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি।
এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্ট তার বিরুদ্ধে ‘অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা’র অভিযোগে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেন। এটি একটি বিচারিক অভিযোগ বা রিপোর্ট; তাকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছে ফরাসি সরকার। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন।
একই সঙ্গে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শুক্রবারও ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।























