বিদেশে গৃহকর্মীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগ
- আপডেট সময় ০২:২২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
- / 15
বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে ভালো কাজের স্বপ্ন দেখিয়ে সৌদি আরবে নেওয়া অনেক নারীকে একটি টিস্যু কোম্পানির আড়ালে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে পতিতাবৃত্তিতে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দালাল চক্রের সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংঘটিত এই মানবপাচারের ঘটনায় গত সাত বছরে বিভিন্ন ধরণের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় ৮০ হাজার কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। এই ভয়াবহ চিত্র দেশের জনশক্তি রপ্তানি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে নতুন করে চরম উদ্বেগ ও সংকটের জন্ম দিয়েছে।
প্রতারণার শিকার শিউলি নামের এক নারী গত ২০২৫ সালে ভাগ্য বদলের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানে প্রাথমিক কর্মস্থলে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করলে, স্থানীয় দালালেরা তাকে একটি টিস্যু কোম্পানিতে আকর্ষণীয় কাজের প্রলোভন দেখায়। এজাহারে ও ভুক্তভোগীর বয়ানে উল্লেখ আছে, পরে তাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে জোরপূর্বক বাণিজ্যিক যৌন কাজে বাধ্য করা হয় এবং নিয়মিত মারধরসহ ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও কোনো চিকিৎসা না দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। একাধিক স্থানে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই নারী একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাস কারাভোগের পর অবশেষে দেশে ফিরে সন্তান জন্ম দেন।
অভিবাসন খাতের এই চরম বিশৃঙ্খলা ও নির্যাতনের হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২ হাজার নারী কর্মী নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ থেকে প্রায় ৭৪ হাজার পুরুষ কর্মীও শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন, যাদের একটি বড় অংশই দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। চলতি ২০ Font২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত আরও প্রায় ২৪ হাজার কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন, যার মধ্যে পুরুষ কর্মীর সংখ্যাই ২৩ হাজারের বেশি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির দেওয়া তথ্যমতে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসেছেন এবং তাদের বেশিরভাগই কর্মস্থলে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিদেশে মারা যাওয়া অন্তত ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, নারীদের বিদেশে পাঠানোর আগে তাদের যথাযথ কাজের প্রশিক্ষণ ও সঠিক বাছাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে ফেরার পর যেন দেশের মাটিতে আইনি বিচার নিশ্চিত করা যায়, সেই ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
এই সংকটজনক পরিস্থিতির বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর গণমাধ্যমকে জানান, কোনো ব্যক্তি, রিক্রুটিং এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মী নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরব ও ওমানসহ কয়েকটি দেশে স্থানীয় লিগ্যাল ফার্মের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আইনি সহায়তার কাজ শুরু হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। তবে সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছদ্মবেশী দালাল চক্রের এই তৎপরতা দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা রোধে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন করা এখন সময়ের দাবি।






















