ঢাকা ০১:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম :
‎সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সবুজ সংকেত ট্রাম্প প্রশাসনের ‎ মিত্র দলগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা, ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন তারেক রহমান মেসিকে ছাড়াই দেশে টিম আর্জেন্টিনা, লাল গালিচায় উষ্ণ অভ্যর্থনা সাতক্ষীরায় শিশুর মরদেহ আলমারি থেকে উদ্ধার, গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত নারী ইরানে টানা মার্কিন হামলার দশম দিন, পাল্টা হামলা কুয়েতে দাবি ইরানের ১৯ জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির শঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত ‎নরেন্দ্র মোদি বিক্ষোভের মুখে সংসদ ছাড়লেন, রণক্ষেত্র দিল্লিতে ‎মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা হামলার দাবি ‎আজ রাতেও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, ১৬ অঞ্চলে দমকা হাওয়ার সতর্কতা

দুই মুঠো ভাতের জন্য সন্তান বিক্রি করছেন আফগান বাবার

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০২:০০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • / 89

ছবি: সংগৃহীত

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক মন্দা ও মানবিক বিপর্যয় দিন দিন এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। আন্তর্জাতিক মহলের অর্থসাহায্য কমে যাওয়া, তীব্র বেকারত্ব, খরা এবং চরম খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়ে দেশটির লাখ লাখ পরিবার এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাম্প্রতিক এক হৃদয়বিদারক প্রতিবেদনে আফগান জনগণের এই চরম অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশটির অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ ‘ঘোর’-এর রাজধানী চাঘচারানের শ্রমবাজারে প্রতিদিন ভোর থেকেই শত শত মানুষ কাজের আশায় এসে ভিড় জমান। তবে তীব্র অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে কাজ মিলছে খুব কম মানুষেরই। দিন শেষে অধিকাংশ মানুষই খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন, যার ফলে পরিবারগুলোতে দেখা দিচ্ছে তীব্র অনাহার।

স্থানীয় দিনমজুর জুমা খান তাঁর করুণ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান, গত ছয় সপ্তাহে তিনি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দিনে তাঁর আয় ছিল মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (যা প্রায় ২.৩৫ থেকে ৩.১৩ মার্কিন ডলারের সমতুল্য)। এই সামান্য আয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার সন্তান ও স্ত্রী ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে টাকা ধার করে খাবার কিনেছি। প্রতিদিন এই ভয়ে থাকি যে আমার সন্তানরা বুঝি না খেয়েই মারা যাবে।” একই এলাকার বাসিন্দা রাবানি ও খোয়াজা আহমদের মতো বহু মানুষ ক্ষুধার তীব্রতায় আত্মহত্যা করার মতো চরম হতাশাজনক চিন্তাও করছেন।

আরও পড়ুন  ওমারজাইয়ের অলরাউন্ড দাপট: আমিরাতকে হারিয়ে প্রথম জয় আফগানদের

জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে বর্তমানে প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জনই তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছেন না। প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন (৪৭ লাখ) মানুষ এখন পুরোদমে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
এই চরম দারিদ্র্যের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর রূপ দেখা যাচ্ছে ঘোর প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে।

দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে না পেরে অনেক বাবা তাদের নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে বিক্রি করার মতো অত্যন্ত বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাগচারানের পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল রশিদ আজিমি তাঁর সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তান রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “আমি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ অসহায়। কাজ না পেয়ে যখন ঘরে ফিরি, সন্তানরা এসে রুটি চায়। আমি কোথা থেকে দেব? ওদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের কলিজা ছিঁড়ে গেলেও আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত।”

অপর এক বাসিন্দা সাঈদ আহমদ জানান, পরিবারের চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পেরে তিনি তাঁর পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানকে ২ লক্ষ আফগানিতে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন; শর্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে মেয়েটিকে ওই পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ছেলেদের তুলনায় কন্যাসন্তান বিক্রির হার অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর আফগানিস্তানে আসা বৈশ্বিক সহায়তার পরিমাণ ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একই সাথে ভেঙে পড়েছে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা। চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে শয্যা সংকটের কারণে এক এক বেডে দুটি করে শিশু রাখা হচ্ছে। হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। পর্যাপ্ত ওষুধ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বেড না থাকায় চিকিৎসকেরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। বহু পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে অসুস্থ সন্তানদের হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসে আফগানিস্তানে এক চরম মানবিক বিপর্যয় দৃশ্যমান হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

দুই মুঠো ভাতের জন্য সন্তান বিক্রি করছেন আফগান বাবার

আপডেট সময় ০২:০০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক মন্দা ও মানবিক বিপর্যয় দিন দিন এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। আন্তর্জাতিক মহলের অর্থসাহায্য কমে যাওয়া, তীব্র বেকারত্ব, খরা এবং চরম খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়ে দেশটির লাখ লাখ পরিবার এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাম্প্রতিক এক হৃদয়বিদারক প্রতিবেদনে আফগান জনগণের এই চরম অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশটির অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ ‘ঘোর’-এর রাজধানী চাঘচারানের শ্রমবাজারে প্রতিদিন ভোর থেকেই শত শত মানুষ কাজের আশায় এসে ভিড় জমান। তবে তীব্র অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে কাজ মিলছে খুব কম মানুষেরই। দিন শেষে অধিকাংশ মানুষই খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন, যার ফলে পরিবারগুলোতে দেখা দিচ্ছে তীব্র অনাহার।

স্থানীয় দিনমজুর জুমা খান তাঁর করুণ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান, গত ছয় সপ্তাহে তিনি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দিনে তাঁর আয় ছিল মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (যা প্রায় ২.৩৫ থেকে ৩.১৩ মার্কিন ডলারের সমতুল্য)। এই সামান্য আয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার সন্তান ও স্ত্রী ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে টাকা ধার করে খাবার কিনেছি। প্রতিদিন এই ভয়ে থাকি যে আমার সন্তানরা বুঝি না খেয়েই মারা যাবে।” একই এলাকার বাসিন্দা রাবানি ও খোয়াজা আহমদের মতো বহু মানুষ ক্ষুধার তীব্রতায় আত্মহত্যা করার মতো চরম হতাশাজনক চিন্তাও করছেন।

আরও পড়ুন  আজ শেষ আফগানদের জন্য ইরান ছাড়ার সময়সীমা, গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি

জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে বর্তমানে প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জনই তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছেন না। প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন (৪৭ লাখ) মানুষ এখন পুরোদমে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
এই চরম দারিদ্র্যের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর রূপ দেখা যাচ্ছে ঘোর প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে।

দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে না পেরে অনেক বাবা তাদের নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে বিক্রি করার মতো অত্যন্ত বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাগচারানের পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল রশিদ আজিমি তাঁর সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তান রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “আমি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ অসহায়। কাজ না পেয়ে যখন ঘরে ফিরি, সন্তানরা এসে রুটি চায়। আমি কোথা থেকে দেব? ওদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের কলিজা ছিঁড়ে গেলেও আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত।”

অপর এক বাসিন্দা সাঈদ আহমদ জানান, পরিবারের চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পেরে তিনি তাঁর পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানকে ২ লক্ষ আফগানিতে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন; শর্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে মেয়েটিকে ওই পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ছেলেদের তুলনায় কন্যাসন্তান বিক্রির হার অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর আফগানিস্তানে আসা বৈশ্বিক সহায়তার পরিমাণ ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একই সাথে ভেঙে পড়েছে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা। চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে শয্যা সংকটের কারণে এক এক বেডে দুটি করে শিশু রাখা হচ্ছে। হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। পর্যাপ্ত ওষুধ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বেড না থাকায় চিকিৎসকেরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। বহু পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে অসুস্থ সন্তানদের হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসে আফগানিস্তানে এক চরম মানবিক বিপর্যয় দৃশ্যমান হচ্ছে।