ঢাকা ০১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জোর করে পদত্যাগ করানো বৈধ নয়: হাইকোর্ট

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৫৭:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 21

ছবি সংগৃহীত

 

কোনো শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পুনর্বহালের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন  মার্কিন সেনাবাহিনীর সচিবের পদত্যাগ

মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র মামলায় বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে দেওয়া এ রায়ের অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।

রিটকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন ও বিধি জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।

মামলার বিবরণে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।

এরপর ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান আলকাছ উদ্দিন। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ চান তিনি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালেই হাইকোর্টে রিট করেন আলকাছ উদ্দিন। প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন।

পরে গত ২০ আগস্ট আগের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের আইনগত কোনো বৈধতা ছিল না। তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল রাখতে আইনগতভাবে বাধ্য ছিল এবং তিনি অবিলম্বে পুনর্বহালের অধিকারী ছিলেন।

আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের ম্যানেজিং কমিটির প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডের নির্দেশনা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার নীতির পরিপন্থি। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা আইনগতভাবে বাধ্য।

আদালত বলেন, সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তাই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে আলকাছ উদ্দিনকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হলো।

পাশাপাশি এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য-সচিবের এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও রয়েছে।

সবশেষে আদালত পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার আলোকে রুলটি নিষ্পত্তি করেন এবং রুল জারির সময় দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল ও প্রত্যাহার করে নেন।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

জোর করে পদত্যাগ করানো বৈধ নয়: হাইকোর্ট

আপডেট সময় ১২:৫৭:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

কোনো শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পুনর্বহালের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন  মার্কিন সেনাবাহিনীর সচিবের পদত্যাগ

মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র মামলায় বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে দেওয়া এ রায়ের অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।

রিটকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন ও বিধি জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।

মামলার বিবরণে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।

এরপর ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান আলকাছ উদ্দিন। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ চান তিনি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালেই হাইকোর্টে রিট করেন আলকাছ উদ্দিন। প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন।

পরে গত ২০ আগস্ট আগের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের আইনগত কোনো বৈধতা ছিল না। তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল রাখতে আইনগতভাবে বাধ্য ছিল এবং তিনি অবিলম্বে পুনর্বহালের অধিকারী ছিলেন।

আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের ম্যানেজিং কমিটির প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডের নির্দেশনা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার নীতির পরিপন্থি। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা আইনগতভাবে বাধ্য।

আদালত বলেন, সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তাই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে আলকাছ উদ্দিনকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হলো।

পাশাপাশি এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য-সচিবের এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও রয়েছে।

সবশেষে আদালত পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার আলোকে রুলটি নিষ্পত্তি করেন এবং রুল জারির সময় দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল ও প্রত্যাহার করে নেন।