ঢাকা ০৯:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
শিরোনাম :
ভিন্ন সাহাবুদ্দিনকে সাবেক রাষ্ট্রপতি ভেবে ভুয়া খবর, অন্তত ২০ গণমাধ্যমে সংসদে ভোটে অলি আহমদকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত মির্জা ফখরুল বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের পরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি হাফেজ নুরুদ্দিন বিশ্বসেরা আস্থা তৈরি হলে ভারত সফর: হুমায়ুন কবির ঈশ্বরদীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা গুলিবিদ্ধ ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

আস্থা তৈরি হলে ভারত সফর: হুমায়ুন কবির

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০১:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
  • / 47

ছবি: সংগৃহীত

 

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে সফরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

আরও পড়ুন  তারেক রহমানসহ আটজন ঘুষ মামলায় পেলেন বেকসুর খালাস

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা আলোচনা থাকলেও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না। তবে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক থাকবে।

গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডে সরকারি বাসভবনে বাসসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক জোটের সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপরও নির্ভর করছে। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষ্য, বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ পর্যায়ের সফরের প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার অভিযোগ, বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের সরকারের দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে সুযোগ দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম এবং দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এই নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হওয়ার পথে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি এবং বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ইইউর সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। চীন থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। এই সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবে। সেখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির বিষয়ে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হতে পারে বলে জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও আশার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে। শিগগিরই জটিলতা দূর করে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তার মতে, এই অর্জন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

জাতিসংঘের এই প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে মিয়ানমার ও চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর নির্দিষ্ট আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা জোরদার করার কথা বলেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দাবি, সরকারের গত ১৮০ দিনে একটি সুদৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাফল্য এবং সরকারের নেওয়া কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হুমায়ুন কবিরের পেশাগত জীবনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লিডস ল’ স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। পেশাগত জীবনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের সঙ্গে কাজ করেছেন। লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আস্থা তৈরি হলে ভারত সফর: হুমায়ুন কবির

আপডেট সময় ০১:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

 

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে সফরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

আরও পড়ুন  তারেক রহমানসহ আটজন ঘুষ মামলায় পেলেন বেকসুর খালাস

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা আলোচনা থাকলেও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না। তবে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক থাকবে।

গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডে সরকারি বাসভবনে বাসসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক জোটের সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপরও নির্ভর করছে। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষ্য, বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ পর্যায়ের সফরের প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার অভিযোগ, বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের সরকারের দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে সুযোগ দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম এবং দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এই নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হওয়ার পথে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি এবং বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ইইউর সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। চীন থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। এই সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবে। সেখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির বিষয়ে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হতে পারে বলে জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও আশার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলে অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে। শিগগিরই জটিলতা দূর করে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তার মতে, এই অর্জন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

জাতিসংঘের এই প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে মিয়ানমার ও চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর নির্দিষ্ট আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা জোরদার করার কথা বলেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দাবি, সরকারের গত ১৮০ দিনে একটি সুদৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাফল্য এবং সরকারের নেওয়া কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হুমায়ুন কবিরের পেশাগত জীবনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লিডস ল’ স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। পেশাগত জীবনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের সঙ্গে কাজ করেছেন। লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।