সৌদি জোটে বাংলাদেশ: সামনে কী কী সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ?
- আপডেট সময় ০১:৪৪:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
- / 23
লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩ দেশকে নিয়ে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।
এ জোটে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব, সম্ভাব্য লাভ এবং ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, শ্রমবাজার এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধের ঘোষণায় বিকল্প এই সমুদ্রপথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ভৌগোলিকভাবে ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
বিশ্বের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই রুটে অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জোটের উদ্দেশ্য হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়াও এ জোটে রয়েছে তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এ জোটে অংশগ্রহণের পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। সেখানে ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।
১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও যুদ্ধ-পরবর্তী কুয়েত পুনর্গঠনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদের মতে, এ জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক সামুদ্রিক যুদ্ধ কৌশল, সাবমেরিনবিরোধী টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ মহড়ার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও বাড়বে।
তিনি আরও মনে করেন, লোহিত সাগর নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে নতুন রপ্তানি বাজার এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে এ জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যে ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে, সেই অবস্থান বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো পদক্ষেপ ইরান বিবেচনায় রাখবে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন নয়। ফলে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি, বীমা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়গুলোও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোটে অংশগ্রহণের পরও সেই ভারসাম্য ধরে রাখা হবে বাংলাদেশের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
তাদের ভাষ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশেরও নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। তবে সেই স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি\



















