হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘মাইন’ আতঙ্ক, ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নামছে যুক্তরাষ্ট্র
- আপডেট সময় ০২:৫৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
- / 21
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই কৌশলগত সমুদ্রপথটি পুনরায় সচল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাইন অপসারণ অভিযানের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এসব মাইনের সঠিক অবস্থান নিয়ে চরম ধোঁয়াশা থাকায় পুরো অভিযানটি এখন সামরিক বিশেষজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র ও এলাকাটির সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, যুদ্ধজাহাজ হারালেও ইরান তাদের ক্ষুদ্র নৌযানের বহর ব্যবহার করে সমুদ্রের বিভিন্ন অংশে আধুনিক মাইন পেতে রেখেছে। তেহরান বর্তমানে কেবল নির্দিষ্ট মাশুল বা ‘টোল’ পরিশোধকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেই এই পথে যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরান সম্ভবত নিজেও এখন সব মাইনের সঠিক অবস্থান শনাক্ত বা সেগুলো সরিয়ে ফেলতে সক্ষম নয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের হাতে এখনো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মাইনবাহী ছোট নৌকা অক্ষত রয়েছে। বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি মাইনকেই তারা প্রধান প্রতিরক্ষা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই অভিযানে ইরান মূলত ‘মাহাম-৩’ এবং ‘মাহাম-৭’ নামক দুই ধরনের শক্তিশালী মাইন মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে মাহাম-৩ মাইনটি ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত কার্যকর এবং মাহাম-৭ মাইনটি সমুদ্রের তলদেশে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
প্রযুক্তিগতভাবে এই মাইনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। এগুলোতে থাকা আধুনিক সেন্সর জাহাজের সরাসরি সংস্পর্শে না এসেও কেবল চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। ফলে সাধারণ মাইন অপসারণকারী জাহাজের জন্য এগুলো বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজগুলো সহজেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিকল্প আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। পানির নিচে মাইন শনাক্তে চালকবিহীন জলযান ‘নাইফফিশ’ এবং দ্রুতগামী নৌযান ‘এমসিএম’ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার থেকে ‘আর্চারফিশ’ সিস্টেম ব্যবহার করে মাইন ধ্বংস করার পরিকল্পনাও রয়েছে ওয়াশিংটনের। যদিও এসব পদ্ধতিতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কম, তবে ড্রোন বা হেলিকপ্টারকে মাইনের কাছাকাছি অবস্থানে থাকতে হবে, যা ইরানের হামলার নাগালে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ মাইনের মাধ্যমে বন্ধ করা নিষিদ্ধ হলেও ইরান হরমুজ প্রণালির একাংশকে নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা বলে দাবি করে আসছে। বড় সংকটের জায়গা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। ফলে আইনি পথে এই অচলাবস্থা নিরসনের সুযোগও সীমিত।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় থাকায় ইরান মাইন পোঁতার বিস্তারিত মানচিত্র বা ‘মাইন ম্যাপ’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। যদি সঠিক মানচিত্র পাওয়া না যায়, তবে হরমুজ প্রণালি পরিষ্কার করে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ করতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

























