ঢাকা ০৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট: নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৭:২০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • / 167

ছবি সংগৃহীত

 

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরান চীনের তৈরি একটি অত্যাধুনিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাতে এই তথ্য সামনে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেইজিংয়ের সহযোগিতায় সংগৃহীত এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে রণক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে নজিরবিহীন সুবিধা প্রদান করেছে।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ‘টিইই-০১বি’ (TEE-01B) নামের এই স্যাটেলাইটটি ২০২৪ সালের শেষভাগে চীন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তীতে ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ পদ্ধতির মাধ্যমে কক্ষপথেই এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স। মূলত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিখুঁত স্থানাঙ্ক এবং ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধারণ করতে এই কৃত্রিম উপগ্রহটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  মহাকাশে চীনের এআই কম্পিউটার: ১২টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, মোট পাঠানো হবে এরকম ২৮০০ টি স্যাটেলাইট

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসিকে ‘এম্পোস্যাট’ পরিচালিত আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো যুদ্ধের সময় হামলার শিকার হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানের এই বৈশ্বিক অবকাঠামো তেহরানের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।

নথিপত্রে দেখা যায়, গত ১৩ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে এই স্যাটেলাইটটি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির উচ্চমানের ছবি সংগ্রহ করেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৪ মার্চ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই ঘাঁটিতে পাঁচটি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার আগে ও পরে ছবি তোলার মাধ্যমে আইআরজিসি তাদের অভিযানের কার্যকারিতা যাচাই করেছে।

এছাড়া জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং-এর মতো স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনাগুলোও এই স্যাটেলাইটের নজরদারিতে ছিল। এমনকি ওমান ও জিবুতির মার্কিন ঘাঁটিসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতেও নজরদারি চালানো হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজিউস্কির মতে, এই স্যাটেলাইটটি কোনো বেসামরিক কাজে নয়, বরং সরাসরি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আধা মিটার রেজোল্যুশনের ছবি তুলতে সক্ষম, যা পশ্চিমা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটগুলোর সমতুল্য। এর আগে আইআরজিসির হাতে থাকা ‘নূর-৩’ স্যাটেলাইটটি মাত্র ৫ মিটার রেজোল্যুশনের ছবি দিতে পারত। নতুন এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ইরানের লক্ষ্যভেদী সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফাঁস হওয়া একটি নথিতে আইআরজিসির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের স্বাক্ষর রয়েছে, যেখানে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য ৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। যদিও চীনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘আর্থ আই কো’ দাবি করেছে যে, এটি কৃষি ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের দাবি, কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীন পরোক্ষভাবে ইরানকে এই সামরিক সুবিধা প্রদান করেছে।

প্রাক্তন সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, রাশিয়া ও চীনের সমন্বিত গোয়েন্দা তথ্য এবং এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করেছে। এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা ইরানের ভেতরে থাকা বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে এই কমান্ড নেটওয়ার্কটি অকার্যকর করার চেষ্টা করেছে।

চীন সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের খবর ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব। তবে মার্কিন প্রশাসন এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি একটি মার্কিন এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেও চীনা সহায়তার সন্দেহ করা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস থেকে এই নির্দিষ্ট চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করা হলেও, মার্কিন পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র যদি ইরানকে সরাসরি সামরিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়, তবে তাদের কঠোর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। বর্তমানে এই স্যাটেলাইট বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট: নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আপডেট সময় ০৭:২০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

 

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরান চীনের তৈরি একটি অত্যাধুনিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাতে এই তথ্য সামনে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেইজিংয়ের সহযোগিতায় সংগৃহীত এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে রণক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে নজিরবিহীন সুবিধা প্রদান করেছে।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ‘টিইই-০১বি’ (TEE-01B) নামের এই স্যাটেলাইটটি ২০২৪ সালের শেষভাগে চীন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তীতে ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ পদ্ধতির মাধ্যমে কক্ষপথেই এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স। মূলত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিখুঁত স্থানাঙ্ক এবং ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধারণ করতে এই কৃত্রিম উপগ্রহটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  ইরানের বিপ্লবী বাহিনীর ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ অভিযান শুরু

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসিকে ‘এম্পোস্যাট’ পরিচালিত আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো যুদ্ধের সময় হামলার শিকার হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানের এই বৈশ্বিক অবকাঠামো তেহরানের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।

নথিপত্রে দেখা যায়, গত ১৩ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে এই স্যাটেলাইটটি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির উচ্চমানের ছবি সংগ্রহ করেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৪ মার্চ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই ঘাঁটিতে পাঁচটি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার আগে ও পরে ছবি তোলার মাধ্যমে আইআরজিসি তাদের অভিযানের কার্যকারিতা যাচাই করেছে।

এছাড়া জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং-এর মতো স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনাগুলোও এই স্যাটেলাইটের নজরদারিতে ছিল। এমনকি ওমান ও জিবুতির মার্কিন ঘাঁটিসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতেও নজরদারি চালানো হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজিউস্কির মতে, এই স্যাটেলাইটটি কোনো বেসামরিক কাজে নয়, বরং সরাসরি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আধা মিটার রেজোল্যুশনের ছবি তুলতে সক্ষম, যা পশ্চিমা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটগুলোর সমতুল্য। এর আগে আইআরজিসির হাতে থাকা ‘নূর-৩’ স্যাটেলাইটটি মাত্র ৫ মিটার রেজোল্যুশনের ছবি দিতে পারত। নতুন এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ইরানের লক্ষ্যভেদী সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফাঁস হওয়া একটি নথিতে আইআরজিসির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের স্বাক্ষর রয়েছে, যেখানে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য ৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। যদিও চীনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘আর্থ আই কো’ দাবি করেছে যে, এটি কৃষি ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের দাবি, কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীন পরোক্ষভাবে ইরানকে এই সামরিক সুবিধা প্রদান করেছে।

প্রাক্তন সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, রাশিয়া ও চীনের সমন্বিত গোয়েন্দা তথ্য এবং এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করেছে। এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা ইরানের ভেতরে থাকা বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে এই কমান্ড নেটওয়ার্কটি অকার্যকর করার চেষ্টা করেছে।

চীন সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের খবর ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব। তবে মার্কিন প্রশাসন এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি একটি মার্কিন এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেও চীনা সহায়তার সন্দেহ করা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস থেকে এই নির্দিষ্ট চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করা হলেও, মার্কিন পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র যদি ইরানকে সরাসরি সামরিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়, তবে তাদের কঠোর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। বর্তমানে এই স্যাটেলাইট বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।