কোচিং সেন্টার বন্ধসহ নানা নিয়মের শিক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত
- আপডেট সময় ০১:৩০:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 47
দেশে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘শিক্ষা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। প্রস্তাবিত এই আইনে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার এবং নোট-গাইড বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
১১টি অধ্যায় ও ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত এই খসড়া আইনটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে জনগণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত opinion_edu_act@moedu.gov.bd ইমেইলে যেকোনো ব্যক্তি বা পক্ষ তাদের মতামত জানাতে পারবেন।
কোচিং ও গাইড বই নিয়ে কঠোর অবস্থান
খসড়া আইনের ১৫ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশে সব প্রকার বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, গাইড বই এবং নোট বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্যবইমুখী করতে ধারাবাহিকভাবে এসব কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা হবে। তবে সরকার অনুমোদিত ‘সহায়ক পুস্তক’ এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর বিন্যাস
নতুন আইনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ‘প্রাথমিক’ এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ‘মাধ্যমিক’ স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
শারীরিক শাস্তি ও বুলিং প্রতিরোধ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা দিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। ৩৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিপরীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ক্যাম্পাসে র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কওমি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা
প্রস্তাবিত আইনে প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার সমান গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায় পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষক নিয়োগে পরিবর্তন
অভিন্ন গ্রেডিং: স্নাতক পর্যায়ে দেশজুড়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি (UGC) নির্ধারিত অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হবে।
গবেষণা: উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ শক্তিশালী করা এবং গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ‘জাতীয় গবেষণা পরিষদ’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
ইউনিক আইডি: প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি একক পরিচিতি নম্বর বা ইউনিক আইডি থাকবে।
এনটিআরসিএ: বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।
সম্পত্তি রক্ষা: সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা ইজারা দিতে পারবে না।
অনলাইন লার্নিং: ই-লার্নিং জনপ্রিয় করতে দেশব্যাপী একটি সাধারণ অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) চালু করা হবে।
খসড়া আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আইনটি আপাতত বলবৎ অন্য যেকোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।



















