ঢাকা ০৮:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

অর্থনৈতিক সংকট থেকে সামাজিক বিস্ফোরণ, টালমাটাল ইরানের শাসনব্যবস্থা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:৩৯:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 1281

ছবি সংগৃহীত

 

ইরানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা দেশটিকে এক গভীর সামাজিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম বিভিন্ন শ্রেণি ও মতের মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমেছে।

শহরের মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, এমনকি একসময় সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী শ্রেণিও এখন আন্দোলনে যুক্ত। এই অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতিকে অনেকেই ইরানের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ১২ দিনের সামরিক সংঘাতের পর ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খায়। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ। এসবের দায় গিয়ে পড়ছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর, যিনি বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী।

আরও পড়ুন  ইরানের হুঁশিয়ারি: আক্রমণ হলে কঠোর জবাব পাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র

আন্দোলনকারীদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও ক্ষোভের মূল জায়গা অভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের জীবনের ব্যবধান এখন অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে।

জেনেভাভিত্তিক গ্লোবাল গভর্ন্যান্স সেন্টারের গবেষক ফারজান সাবেত মনে করেন, পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং চলতি বছরে তা আরও জটিল হতে পারে। তাঁর মতে, বিদেশি হস্তক্ষেপ কিংবা সামরিক ও অভিজাত শ্রেণির ভেতরের বিভাজন আন্দোলনকে আরও উসকে দিতে পারে।
লন্ডনের বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরান একটি মৌলিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। তবে এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিপ্লব নয়। তাঁর ভাষায়, ইরানিরা মূলত এমন এক সামাজিক রূপান্তর চাইছে, যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত হবে।
২০১৮ সালের পর এটিই সরকারবিরোধী তৃতীয় বড় আন্দোলন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, সরকার আবারও কঠোর দমননীতির পথ বেছে নিতে পারে। ইতিমধ্যে শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ মিলিশিয়ার ভূমিকা ঘিরেও উদ্বেগ বাড়ছে। সহিংস দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার কার্যত কোণঠাসা। একদিকে জাতিসংঘের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে খামেনির সর্বময় নিয়ন্ত্রণে তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত। অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে তিনি যে বাজেট প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে ভর্তুকি কমানো, বিনিময় হার সংস্কার এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা রয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর চাপই বাড়িয়েছে।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৫২ শতাংশ বলা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। মাসিক ৭ ডলার সমপরিমাণ ভাতা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, ইরানের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাঁর মতে, পেজেশকিয়ানকে প্রকৃত ক্ষমতা দিলে তিনি অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারেন।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা বাড়ছে। গত বছর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার প্রশ্নে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মতো নেতারাও প্রকাশ্যে সমালোচনায় মুখর।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের চাপ এবং ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরের দ্বন্দ্ব মিলিয়ে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডেনিস সিত্রিনোভিচ বলেন, সংকট যত দীর্ঘ হবে, ততই নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে সব বিশ্লেষকই বিপ্লবের কথা বলছেন না। কেউ কেউ ‘নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব পরিবর্তন’-এর ধারণা সামনে আনছেন, যেখানে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে হাঁটা হতে পারে।

অন্যদিকে বারবারা স্ল্যাভিনের মতো বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো গণতান্ত্রিক রূপান্তর। তাঁর মতে, ইরানের নাগরিক সমাজে দক্ষ নেতৃত্বের অভাব নেই, কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখন কারাগারে।

তিনি ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকের চীনের তুলনা টানেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সেই ধরনের বাস্তববাদী সংস্কার ইরানে আদৌ সম্ভব হবে কি না।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

অর্থনৈতিক সংকট থেকে সামাজিক বিস্ফোরণ, টালমাটাল ইরানের শাসনব্যবস্থা

আপডেট সময় ১০:৩৯:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

 

ইরানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা দেশটিকে এক গভীর সামাজিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম বিভিন্ন শ্রেণি ও মতের মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমেছে।

শহরের মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, এমনকি একসময় সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী শ্রেণিও এখন আন্দোলনে যুক্ত। এই অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতিকে অনেকেই ইরানের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ১২ দিনের সামরিক সংঘাতের পর ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খায়। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ। এসবের দায় গিয়ে পড়ছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর, যিনি বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী।

আরও পড়ুন  ইরানে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি পরিপন্থী: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

আন্দোলনকারীদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও ক্ষোভের মূল জায়গা অভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের জীবনের ব্যবধান এখন অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে।

জেনেভাভিত্তিক গ্লোবাল গভর্ন্যান্স সেন্টারের গবেষক ফারজান সাবেত মনে করেন, পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং চলতি বছরে তা আরও জটিল হতে পারে। তাঁর মতে, বিদেশি হস্তক্ষেপ কিংবা সামরিক ও অভিজাত শ্রেণির ভেতরের বিভাজন আন্দোলনকে আরও উসকে দিতে পারে।
লন্ডনের বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরান একটি মৌলিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। তবে এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিপ্লব নয়। তাঁর ভাষায়, ইরানিরা মূলত এমন এক সামাজিক রূপান্তর চাইছে, যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত হবে।
২০১৮ সালের পর এটিই সরকারবিরোধী তৃতীয় বড় আন্দোলন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, সরকার আবারও কঠোর দমননীতির পথ বেছে নিতে পারে। ইতিমধ্যে শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ মিলিশিয়ার ভূমিকা ঘিরেও উদ্বেগ বাড়ছে। সহিংস দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার কার্যত কোণঠাসা। একদিকে জাতিসংঘের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে খামেনির সর্বময় নিয়ন্ত্রণে তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত। অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে তিনি যে বাজেট প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে ভর্তুকি কমানো, বিনিময় হার সংস্কার এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা রয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর চাপই বাড়িয়েছে।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৫২ শতাংশ বলা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। মাসিক ৭ ডলার সমপরিমাণ ভাতা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, ইরানের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাঁর মতে, পেজেশকিয়ানকে প্রকৃত ক্ষমতা দিলে তিনি অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারেন।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা বাড়ছে। গত বছর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার প্রশ্নে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মতো নেতারাও প্রকাশ্যে সমালোচনায় মুখর।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের চাপ এবং ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরের দ্বন্দ্ব মিলিয়ে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডেনিস সিত্রিনোভিচ বলেন, সংকট যত দীর্ঘ হবে, ততই নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে সব বিশ্লেষকই বিপ্লবের কথা বলছেন না। কেউ কেউ ‘নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব পরিবর্তন’-এর ধারণা সামনে আনছেন, যেখানে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে হাঁটা হতে পারে।

অন্যদিকে বারবারা স্ল্যাভিনের মতো বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো গণতান্ত্রিক রূপান্তর। তাঁর মতে, ইরানের নাগরিক সমাজে দক্ষ নেতৃত্বের অভাব নেই, কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখন কারাগারে।

তিনি ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকের চীনের তুলনা টানেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সেই ধরনের বাস্তববাদী সংস্কার ইরানে আদৌ সম্ভব হবে কি না।