ভর্তুকির সার পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে, ফিরছে ইয়াবা-আইস
- আপডেট সময় ১২:০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 22
সরকারের ভর্তুকিতে কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা ইউরিয়া ও ডিএপি সার দীর্ঘদিন ধরে সাগরপথে পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র এসব সার পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে সারবোঝাই ট্রলার, কার্গো বোট ও বহনকারীরা আটক হলেও পাচারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে একের পর এক চালান জব্দ হলেও বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য। সাগরপথের পাশাপাশি স্থল ও নদীপথের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টও ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।
বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকির কারণে ইউরিয়া ও ডিএপিসহ বিভিন্ন সারের দাম তুলনামূলক কম। বিপরীতে মিয়ানমার ও ভারতে এসব সারের দাম বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সার পাচারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, স্থানীয় ডিলার বা নির্দিষ্ট বাফার গুদাম থেকে সংগ্রহ করা সার প্রথমে ট্রাকে করে চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, হালিশহর, পতেঙ্গা ও সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়। পরে গভীর রাতে মাছ ধরার ট্রলার বা কার্গো বোটে তুলে বঙ্গোপসাগর হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু অঞ্চলের দিকে পাঠানো হয়।
এ কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাঝিদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে সার নৌযানে তুলে মিয়ানমারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে অভিযানের সময় শ্রমিক বা পরিবহনকর্মীরা আটক হলেও মূল পাচারকারীরা অনেক সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর দবিরখাল এলাকায় একটি ট্রাক থেকে ফিশিং বোটে সার স্থানান্তরের সময় ১১ টন বা ২২০ বস্তা কাফকোর উৎপাদিত রাসায়নিক সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারে পাচারের সময় ৬০০ কেজি ইউরিয়া সার উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম (২৭) নামে একজনকে আটক করা হয়।
এ ছাড়া জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে আটটি পৃথক অভিযানে মোট ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০০ বস্তা ছিল ডায়ামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি এবং বাকিগুলো ইউরিয়া সার।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সার ছোট-বড় নৌযানে করে উপকূলীয় পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ চোরাচালান ও পাচার বন্ধে সীমান্ত ও সমুদ্রপথে কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আনজুমানপাড়া অন্যতম প্রধান রুট বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে আনা সার প্রথমে পালংখালী স্টেশনে নেওয়া হয়। পরে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের মাধ্যমে সেগুলো নাফ নদের তীরে পৌঁছে নৌযানে করে মিয়ানমারে পাঠানো হয়।
টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী এবং হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালীকেও স্থানীয়ভাবে পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আনজুমানপাড়ায় ‘সোনামিয়া সিন্ডিকেট’ নামে একটি চক্র সার পাচার নিয়ন্ত্রণ করে। সোনামিয়া ও আবুইয়া নামের দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রে প্রায় ৬০ জন সদস্য রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন রোহিঙ্গা শ্রমিক।
চট্টগ্রাম থেকে সার এনে রামুর একটি গুদামে মজুদের পর পালংখালী হয়ে মিয়ানমারে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে পাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে।
উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থলপথে নজরদারি জোরদার করার পর পাচারকারীরা চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি নৌপথে সার পাচারের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, সার পাচার ঠেকাতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সার পরিবহন ও মজুদের পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য পাচার এবং মিয়ানমার থেকে মাদক প্রবেশের ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা সাগরপথের পাশাপাশি নদী ও স্থলসীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করছে। এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে তাদের ধারণা।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, সরকার ইউরিয়া ও ডিএপিসহ চার ধরনের সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে থাকে। বিভিন্ন অভিযানে সার জব্দের তথ্য পাওয়া গেলেও এসব চালান কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে সবসময় সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে সার বিক্রির কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। কোথাও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে প্রশাসনের সহযোগিতায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।























