ঢাকা ০৫:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

“ট্রেন কেড়ে নিয়েছিল দুই পা, হার মানাতে পারেনি মানিক মিয়াকে”

শেখ আব্দুস সাকুর (উল্লাস)
  • আপডেট সময় ০৪:৫৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 12

ছবি : খবরের কথা

 

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে রিকশা ও ভ্যান মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুই পা হারানো ৬৫ বছর বয়সী মানিক মিয়া। ১৯৮২ সালের এক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারানোর পরও ভিক্ষার পথ বেছে নেননি তিনি। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কাজ শিখে গত ৪২ বছর ধরে নিজের শ্রমেই সংসার চালিয়ে আসছেন কেরানীগঞ্জের আটি বাজারের এই বাসিন্দা।

এলিফ্যান্ট রোডের ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট্ট কর্মস্থলটিতে বসেই দিন কাটে মানিক মিয়ার। সামনে থাকে রেঞ্চ, প্লাস, হাতুড়িসহ বিভিন্ন মেরামতের সরঞ্জাম। রিকশা কিংবা ভ্যানের কোনো সমস্যা নিয়ে চালকেরা এলে ধৈর্য ধরে কাজ করেন তিনি।

মানিক মিয়ার বয়স এখন ৬৫ বছর। ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটি বাজার এলাকায় তার বাড়ি। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে ৪২ বছর ধরে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করছেন তিনি। এই কাজই তার আয়ের প্রধান উৎস।

১৯৮২ সালে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন মানিক মিয়া। ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে তার চোখে ঘুম নেমে এসেছিল। একপর্যায়ে তিনি ট্রেন থেকে পড়ে যান এবং ট্রেনের নিচে তার দুই পা চলে যায়।

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মানিক মিয়া বলেন, ‘গেটের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখে একটু ঘুমঘুম ভাব ছিল। হঠাৎ পড়ে গেলাম। এরপর ট্রেনের নিচে আমার দুইটা পা চলে যায়।’

দুর্ঘটনার পর প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও তখন সামনে ছিল নতুন বাস্তবতা। দুই পা হারানোর পর কীভাবে জীবন ও সংসার চালাবেন, সেই চিন্তাই বড় হয়ে দেখা দেয়।

সে সময় বড় ভাই তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখান। মানিক মিয়ার বড় ভাইও রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করতেন। তার পাশে বসে কাজ দেখার পর একদিন ভাই তাকে এমন একটি কাজ শেখার পরামর্শ দেন, যা বসে করা সম্ভব।

মানিক মিয়া বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পরে ভাবলাম, কী করব। আমার এক বড় ভাই (তাঁরা ভাই) এই কাজ করতেন। উনি বললেন, তোর জন্য এই কাজটাই ভালো হবে। তখন থেকেই শুরু করি। এরপর আর থামিনি। ৪২ বছর ধরে এই কাজ করছি। আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছেন, সেভাবেই চলছে।’

দুর্ঘটনার পর অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে পথে যাননি মানিক মিয়া। নিজের শ্রমের ওপর ভরসা করেই জীবন চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

মানিক মিয়া বলেন, ‘আমি ভিক্ষা পছন্দ করি না। ভিক্ষা করা মানে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া। মানুষ চেষ্টা করলে স্বাবলম্বী হতে পারে। আমি নিজের কাজ করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটপাতেই কাজ করেন তিনি। নেই কোনো স্থায়ী দোকান বা আধুনিক কর্মশালা। খোলা আকাশের নিচেই বছরের পর বছর ধরে চলছে তার কাজ। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি। এই আয় দিয়েই চলে তার সংসার।

জীবনের প্রতি তেমন কোনো অভিযোগ নেই মানিক মিয়ার। তবে কিছু কষ্ট আছে, যা মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মানিক মিয়া বলেন, “কোনো জায়গায় তেমন যেতে পারি না। অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি না। ভালো পছন্দের পোশাকও সবসময় পরতে পারি না। এগুলো আমার নিজের কষ্ট, নিজের ভেতরের কষ্ট।”

মানিক মিয়ার তিন সন্তান। বড় ছেলে রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। ছোট ছেলে কলেজে পড়াশোনা করছেন। আর মেয়েকে বিএ পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন মানিক মিয়া।

তবে তার কর্মজীবনও নানা প্রতিকূলতায় ভরা। বর্ষায় ফুটপাত ভিজে গেলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার গরমের দিনে তীব্র রোদের মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। তবুও সংসারের দায়িত্ব তাকে নিয়মিত কর্মস্থলে নিয়ে আসে।

মানিক মিয়া বলেন, “বৃষ্টি হলে অনেক সমস্যা হয়। যে ফোমের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি, সেটাও ভিজে যায়। তখন কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার গরমের সময়ও অনেক কষ্ট হয়। জীবন তো কষ্টেরই, সবার জীবন এক রকম না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো টানতেই হবে।”

দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্থের পাশাপাশি মানুষের আস্থাকেও নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন মানিক মিয়া। তার কাছে নিয়মিত কাজ করাতে আসা চালকদের অনেকেই তার কাজ ও ব্যবহারে সন্তুষ্ট।

তিনি বলেন, ‘আমি এই কাজে মানুষের অনেক সম্মান পাই। ভিক্ষা করলে এই সম্মান পেতাম না। আমার কাজ ভালো বলে মানুষ আবার আসে। যারা একবার কাজ করায়, তারা পরে আবারও আমার কাছেই আসে।’

নিজের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদেরও অন্যের ওপর নির্ভর না করে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার বিশ্বাস, চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে।

মানিক মিয়ার ভাষায়, ‘মানুষ ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই পারে। চেষ্টা করলে অনেক কিছু হয়। অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের চেষ্টা করা উচিত।’

রিকশা ও ভ্যান মেরামত করাতে আসা চালকদের কাছেও মানিক মিয়া এখন শুধু একজন মিস্ত্রি নন, আস্থার একজন মানুষ। রিকশাচালক রবিউল আউয়াল বলেন, ‘আমি প্রায় আট বছর ধরে ভাইয়ের কাছে কাজ করাই। উনি কখনো অযথা টাকা নেন না। কাজও খুব ভালো করেন। তাই সমস্যা হলেই তার কাছেই চলে আসি।’

আরেক রিকশাচালক আব্দুল গফফার বলেন, ‘উনাকে দেখে কখনো মনে হয় না তিনি প্রতিবন্ধী। নিজের কাজ নিজেই করেন। আমরা অনেক সময় সাহায্য করতে চাই, কিন্তু তিনি বলেন—আমি যতটুকু পারি, নিজেই করব।’

স্থানীয় দোকানদার বাচ্চু মিয়াও দীর্ঘদিন ধরে মানিক মিয়াকে সেখানে কাজ করতে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে তাকে এখানে কাজ করতে দেখছি। বৃষ্টি, রোদ—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। এলাকার সবাই তাকে সম্মান করেন। কারণ তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি।’

এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে মানিক মিয়ার কর্মস্থল ঘিরে তৈরি হয়েছে নিয়মিত গ্রাহকদের আস্থা। অনেক চালক রিকশা বা ভ্যানের সমস্যা হলে অন্য কোথাও না গিয়ে তার কাছেই আসেন। তাদের মতে, কাজের দক্ষতার পাশাপাশি সততা ও আত্মসম্মানবোধই মানিক মিয়াকে আলাদা করে তুলেছে।

মানিক মিয়ার জীবন কেবল প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; নিজের শ্রম ও আত্মমর্যাদাকে অবলম্বন করে দীর্ঘ পথ চলারও গল্প। ১৯৮২ সালের দুর্ঘটনায় তার দুই পা হারিয়েছেন, কিন্তু নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারাননি। চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে সংসারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

জীবনের এই দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে মানিক মিয়ার কোনো অভিযোগ নেই। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালাতে পারা এবং কারও কাছে হাত না পাততে পারাকেই তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

“ট্রেন কেড়ে নিয়েছিল দুই পা, হার মানাতে পারেনি মানিক মিয়াকে”

আপডেট সময় ০৪:৫৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

 

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে রিকশা ও ভ্যান মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুই পা হারানো ৬৫ বছর বয়সী মানিক মিয়া। ১৯৮২ সালের এক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারানোর পরও ভিক্ষার পথ বেছে নেননি তিনি। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কাজ শিখে গত ৪২ বছর ধরে নিজের শ্রমেই সংসার চালিয়ে আসছেন কেরানীগঞ্জের আটি বাজারের এই বাসিন্দা।

এলিফ্যান্ট রোডের ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট্ট কর্মস্থলটিতে বসেই দিন কাটে মানিক মিয়ার। সামনে থাকে রেঞ্চ, প্লাস, হাতুড়িসহ বিভিন্ন মেরামতের সরঞ্জাম। রিকশা কিংবা ভ্যানের কোনো সমস্যা নিয়ে চালকেরা এলে ধৈর্য ধরে কাজ করেন তিনি।

মানিক মিয়ার বয়স এখন ৬৫ বছর। ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটি বাজার এলাকায় তার বাড়ি। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে ৪২ বছর ধরে রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করছেন তিনি। এই কাজই তার আয়ের প্রধান উৎস।

১৯৮২ সালে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন মানিক মিয়া। ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে তার চোখে ঘুম নেমে এসেছিল। একপর্যায়ে তিনি ট্রেন থেকে পড়ে যান এবং ট্রেনের নিচে তার দুই পা চলে যায়।

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মানিক মিয়া বলেন, ‘গেটের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখে একটু ঘুমঘুম ভাব ছিল। হঠাৎ পড়ে গেলাম। এরপর ট্রেনের নিচে আমার দুইটা পা চলে যায়।’

দুর্ঘটনার পর প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও তখন সামনে ছিল নতুন বাস্তবতা। দুই পা হারানোর পর কীভাবে জীবন ও সংসার চালাবেন, সেই চিন্তাই বড় হয়ে দেখা দেয়।

সে সময় বড় ভাই তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখান। মানিক মিয়ার বড় ভাইও রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ করতেন। তার পাশে বসে কাজ দেখার পর একদিন ভাই তাকে এমন একটি কাজ শেখার পরামর্শ দেন, যা বসে করা সম্ভব।

মানিক মিয়া বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পরে ভাবলাম, কী করব। আমার এক বড় ভাই (তাঁরা ভাই) এই কাজ করতেন। উনি বললেন, তোর জন্য এই কাজটাই ভালো হবে। তখন থেকেই শুরু করি। এরপর আর থামিনি। ৪২ বছর ধরে এই কাজ করছি। আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছেন, সেভাবেই চলছে।’

দুর্ঘটনার পর অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে পথে যাননি মানিক মিয়া। নিজের শ্রমের ওপর ভরসা করেই জীবন চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

মানিক মিয়া বলেন, ‘আমি ভিক্ষা পছন্দ করি না। ভিক্ষা করা মানে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া। মানুষ চেষ্টা করলে স্বাবলম্বী হতে পারে। আমি নিজের কাজ করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটপাতেই কাজ করেন তিনি। নেই কোনো স্থায়ী দোকান বা আধুনিক কর্মশালা। খোলা আকাশের নিচেই বছরের পর বছর ধরে চলছে তার কাজ। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি। এই আয় দিয়েই চলে তার সংসার।

জীবনের প্রতি তেমন কোনো অভিযোগ নেই মানিক মিয়ার। তবে কিছু কষ্ট আছে, যা মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মানিক মিয়া বলেন, “কোনো জায়গায় তেমন যেতে পারি না। অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি না। ভালো পছন্দের পোশাকও সবসময় পরতে পারি না। এগুলো আমার নিজের কষ্ট, নিজের ভেতরের কষ্ট।”

মানিক মিয়ার তিন সন্তান। বড় ছেলে রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। ছোট ছেলে কলেজে পড়াশোনা করছেন। আর মেয়েকে বিএ পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন মানিক মিয়া।

তবে তার কর্মজীবনও নানা প্রতিকূলতায় ভরা। বর্ষায় ফুটপাত ভিজে গেলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার গরমের দিনে তীব্র রোদের মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। তবুও সংসারের দায়িত্ব তাকে নিয়মিত কর্মস্থলে নিয়ে আসে।

মানিক মিয়া বলেন, “বৃষ্টি হলে অনেক সমস্যা হয়। যে ফোমের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি, সেটাও ভিজে যায়। তখন কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার গরমের সময়ও অনেক কষ্ট হয়। জীবন তো কষ্টেরই, সবার জীবন এক রকম না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো টানতেই হবে।”

দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্থের পাশাপাশি মানুষের আস্থাকেও নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন মানিক মিয়া। তার কাছে নিয়মিত কাজ করাতে আসা চালকদের অনেকেই তার কাজ ও ব্যবহারে সন্তুষ্ট।

তিনি বলেন, ‘আমি এই কাজে মানুষের অনেক সম্মান পাই। ভিক্ষা করলে এই সম্মান পেতাম না। আমার কাজ ভালো বলে মানুষ আবার আসে। যারা একবার কাজ করায়, তারা পরে আবারও আমার কাছেই আসে।’

নিজের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদেরও অন্যের ওপর নির্ভর না করে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার বিশ্বাস, চেষ্টা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে।

মানিক মিয়ার ভাষায়, ‘মানুষ ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই পারে। চেষ্টা করলে অনেক কিছু হয়। অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের চেষ্টা করা উচিত।’

রিকশা ও ভ্যান মেরামত করাতে আসা চালকদের কাছেও মানিক মিয়া এখন শুধু একজন মিস্ত্রি নন, আস্থার একজন মানুষ। রিকশাচালক রবিউল আউয়াল বলেন, ‘আমি প্রায় আট বছর ধরে ভাইয়ের কাছে কাজ করাই। উনি কখনো অযথা টাকা নেন না। কাজও খুব ভালো করেন। তাই সমস্যা হলেই তার কাছেই চলে আসি।’

আরেক রিকশাচালক আব্দুল গফফার বলেন, ‘উনাকে দেখে কখনো মনে হয় না তিনি প্রতিবন্ধী। নিজের কাজ নিজেই করেন। আমরা অনেক সময় সাহায্য করতে চাই, কিন্তু তিনি বলেন—আমি যতটুকু পারি, নিজেই করব।’

স্থানীয় দোকানদার বাচ্চু মিয়াও দীর্ঘদিন ধরে মানিক মিয়াকে সেখানে কাজ করতে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে তাকে এখানে কাজ করতে দেখছি। বৃষ্টি, রোদ—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। এলাকার সবাই তাকে সম্মান করেন। কারণ তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি।’

এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে মানিক মিয়ার কর্মস্থল ঘিরে তৈরি হয়েছে নিয়মিত গ্রাহকদের আস্থা। অনেক চালক রিকশা বা ভ্যানের সমস্যা হলে অন্য কোথাও না গিয়ে তার কাছেই আসেন। তাদের মতে, কাজের দক্ষতার পাশাপাশি সততা ও আত্মসম্মানবোধই মানিক মিয়াকে আলাদা করে তুলেছে।

মানিক মিয়ার জীবন কেবল প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; নিজের শ্রম ও আত্মমর্যাদাকে অবলম্বন করে দীর্ঘ পথ চলারও গল্প। ১৯৮২ সালের দুর্ঘটনায় তার দুই পা হারিয়েছেন, কিন্তু নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারাননি। চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে সংসারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

জীবনের এই দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে মানিক মিয়ার কোনো অভিযোগ নেই। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালাতে পারা এবং কারও কাছে হাত না পাততে পারাকেই তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন।