কোমর ভেঙে দুই বছর ধরে বিছানাবন্দি, বাঁচার আকুতি বৃদ্ধ সাইদুলের
- আপডেট সময় ০৪:৪৮:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
- / 13
ঢাকার একটি ঝুপড়ি ঘরে দীর্ঘ দুই বছর ধরে কোমর ভেঙে বিছানাবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৭০ ঊর্ধ্ব বয়সী নির্মাণশ্রমিক সাইদুল হক। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তিনি কার্যত চিকিৎসাবঞ্চিত। ব্যথানাশক ওষুধ আর আশ্বাস ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রতিদিনই অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। এখন তার একটাই আকুতি— কেউ যেন তাকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর আগে একটি নির্মাণকাজের সময় উঁচু মাচা থেকে পড়ে কোমর ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান সাইদুল হক। দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। বিছানাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।
বিছানায় শুয়ে থাকা সাইদুল হক প্রায়ই পথচারীদের উদ্দেশে অনুরোধ করে বলেন, ‘আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। আজ নিয়ে যায়, কাল নিয়ে যায়— এভাবেই দিন চলে যাচ্ছে।’
একসময় অন্যের বাড়ি নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও আজ টিন ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই দিন কাটছে তার। স্যাঁতসেঁতে জমির ওপর কাঠের পাটাতনের ওপর বিছানায় শুয়েই কাটে দিন-রাত। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে বিছানাতেই মলমূত্র ত্যাগ করতে হয় তাকে। শেষ কবে গোসল করেছেন, সেটিও মনে করতে পারেন না তিনি।
এলাকাবাসীর দাবি, শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় অনেকেই তার কাছে যেতে চান না। প্রতিবেশীদের দেওয়া ১০ থেকে ২০ টাকা এবং আশপাশের কয়েকটি বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে পাওয়া খাবারের ওপরই নির্ভর করছে তার জীবন।
সাইদুল বলেন, মানুষ কিছু ‘দিলে খাই, না দিলে না খাই।’ আমার আপন বলতে দুনিয়াতে কেউ নাই।
সাইদুল হকের সঙ্গে দীর্ঘদিন নির্মাণকাজে কাজ করা এক সহকর্মী জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি চরম কষ্টে আছেন। অর্থাভাবে তার উন্নত চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
মো . জাকির হোসেন জানান, সাইদুল হকের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। আমার এলাকাবাসী নানা ভাবে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছি না।
জানা যায়, নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বাসিন্দা সাইদুল হক কর্মসূত্রে কুষ্টিয়ায় বিয়ে করেছিলেন। তাদের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। তবে দাম্পত্য জীবন টেকেনি। বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে তার পাশে কোনো স্বজন নেই। খোঁজ নেওয়ার মতোও নেই কোনো আপনজন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব ও চিকিৎসাহীনতার কারণে তার আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। তিনি কখনো একই কথা বারবার বলেন, কখনো অতীত ও বর্তমান গুলিয়ে ফেলেন। শ্রবণশক্তিও অনেকটাই কমে গেছে। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে একাকিত্ব মিলিয়ে প্রতিটি দিন তার কাছে হয়ে উঠেছে কষ্টের।
সাইদুল হক বলেন, ‘আমার কেউ নাই।’ তার এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গ জীবনের বাস্তবতা।
বর্তমানে ব্যথা বাড়লে কয়েকটি ব্যথানাশক ওষুধই তার একমাত্র ভরসা। তবে সেগুলো সাময়িকভাবে যন্ত্রণা কমালেও তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারছে না। এলাকাবাসীর মতে, সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো সাইদুল হকের জীবন অন্যরকম হতে পারত।
একসময় নিজের শ্রমে অন্যের স্বপ্নের ঘর নির্মাণ করেছেন সাইদুল হক। অথচ আজ নিজের জীবন বাঁচাতে অন্যের সহানুভূতি ও সহযোগিতার অপেক্ষায় দিন কাটছে তার। তার ইচ্ছা, একবার ছেলেকে দেখতে চান এবং সুস্থ হয়ে আবার নিজের উপার্জনে জীবন চালাতে চান।
৬০ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব ফখরুল আলম খবরের কথাকে বলেন, বিষয়টি মানবিক, অবশ্যই আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
স্থানীয়দের আশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে চিকিৎসার মাধ্যমে হয়তো নতুন করে বাঁচার সুযোগ পেতে পারেন এই অসহায় নির্মাণশ্রমিক।
























