বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, আটক প্রায় হাজার
- আপডেট সময় ১০:০৭:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 18
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে আবারও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ লিওঁ, লিল, তুলুজ, নঁত, মার্সেই ও বোর্দোয় লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। শনিবার, ২৪ অক্টোবর বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে সরকার। বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় এক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
বিক্ষোভের কারণে প্যারিসের ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশন, ল্যুভরসহ গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর এবং বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। দেশটির প্রধান শহরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করেছে পুলিশ।
গত ১৭ অক্টোবর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নেয় ফরাসি সরকার। আগের সপ্তাহের তুলনায় শনিবার অতিরিক্ত ১০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম মোতায়েন করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি বিশেষায়িত ইউনিট, সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার, পুলিশ কুকুর ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়। রাজধানীর শঁজেলিজে এলাকায় সেনাসদস্যদেরও টহল দিতে দেখা যায়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভের আগে ও চলাকালে তল্লাশি চালিয়ে ধাতব বল, সিসার ছররা, আতশবাজি, গুলতি, তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি বিভিন্ন অস্ত্র, কাতানা ও এয়ারসফট অস্ত্রসহ নানা সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।
জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে নুনেজ বলেন, সহিংসতা কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার কোনো চেষ্টা সহ্য করা হবে না।
সম্ভাব্য ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকাতে প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী দোকানের কাচের সামনে কাঠের প্যানেল বসিয়ে দেন। গত সপ্তাহে দেশজুড়ে হাজার হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা লুটপাটের শিকার হওয়ার পর এবার অনেক ব্যবসায়ী আগেভাগেই নিজেদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেন।
নিরাপত্তার কারণে ল্যুভর, মিউজে দ’অরসে ও প্যারিস অপেরাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।
প্যারিসে অনুমোদিত প্রধান মিছিলটি বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই নির্ধারিত শেষ গন্তব্য পোর্ত দ্য ভিনসেনে পৌঁছায়। তবে মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকার ও আয়োজকদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল।
পুলিশ বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত পথ বাতিল করে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বিকল্প পথ নির্ধারণ করে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, আগের সপ্তাহে ব্যাপক লুটপাটের শিকার হওয়া বাণিজ্যিক এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বামপন্থী নেতারা পুলিশের এই পদক্ষেপকে বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
রাজধানীর বাইরে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। লিওঁ, লিল, তুলুজ ও নঁতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নঁতে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। বোর্দোয় পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়া এবং ব্যারিকেড তৈরির খবরও পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাতে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে আনুমানিক চার লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অন্যতম সিজিটি দাবি করেছে, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আট লাখ। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সরকারের দেওয়া সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
রাজধানী প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়েও দুই পক্ষের হিসাবে বড় পার্থক্য রয়েছে। সিজটির হিসাব অনুযায়ী, সেখানে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ। অন্যদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্যারিস পুলিশের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় এক লাখ ১০ হাজার।
চলমান আন্দোলনে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কর্মীদের পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠন এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দিয়েছেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষা খাতের সংকট, শিক্ষকের ঘাটতি এবং সরকারি সেবার অবনতিকে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন বিক্ষোভকারীরা।
শনিবার দেশজুড়ে ৭০০টির বেশি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন। আন্দোলনকারীরা আগামী ৩১ অক্টোবর আবারও দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সতর্ক করে বলেছেন, সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে আগামী ৫ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘট হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
























