ঢাকা ০৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

উত্তপ্ত দিল্লিতে ২৫ হাজার পুলিশ, বন্ধ ইন্টারনেট-রেলসেবা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১১:০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / 44

ছবি সংগৃহীত

 

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। শহরজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং মধ্য দিল্লির নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা। পাশাপাশি, নিরাপত্তাজনিত কারণে ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের অনুমতি না দিলেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা রাজধানীতে জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। এ কারণে দিল্লির সীমান্ত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরও পড়ুন  মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনায় সতর্ক থাকার আহ্বান পুলিশের

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত থেকেই নিরাপত্তার প্রস্তুতি জোরদার করা হয়। যন্তর মন্তরের আশপাশে বসানো হয়েছে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড। মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পাশাপাশি রেল ও মেট্রো চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুমতি না নেওয়া, অতীতে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার অভিজ্ঞতা এবং বড় জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা ও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিক্ষোভের আগে রাজ্যগুলোকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন ৯ অক্টোবর দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

চিঠিতে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, অনুমতি না পেলেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোকে গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্তে নজরদারির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ এবং দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে। নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির সীমান্ত এলাকায় যানবাহনে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিক্ষোভের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোকজনকে সংগঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা জানতে অনলাইন পোস্ট ও বার্তা পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন। এ কাজে ২০০-র বেশি কনটেন্ট নির্মাতাকে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ও দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরকে ঘিরে প্রায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-র বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কথা রয়েছে।

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সড়কগুলোতে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টির বেশি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশকে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১২০টির বেশি কোম্পানি মোতায়েনের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

স্পর্শকাতর এলাকায় লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া জমায়েত, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি এবং সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি যাচাই করতে বিভিন্ন স্থানে মহড়াও চালানো হয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য ১২টি আটককেন্দ্র প্রস্তুত করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশ সদস্যদের সংযত ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উসকানির মুখেও যাতে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখান, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউসগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আবাসন প্রতিষ্ঠান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ঘর ভাড়া দেওয়া সংস্থা এবং সম্পত্তির মালিকদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে নয়াদিল্লি জেলার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য বডি ক্যামেরার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করতে প্রায় ১০০ জন আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফারকে কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।

জনপথ ও করতব্য পথের সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার কথা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল এ নির্দেশ জারি করে। এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন আইডিয়া ও এমটিএনএলকে নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনও নিরাপত্তার কারণে চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রথমে ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ৪৫টি স্টেশনে সীমিত করা হয়। ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এসব স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।

বিধিনিষেধের আওতায় থাকা স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, নয়াদিল্লি, মান্ডি হাউস, আইটিও, খান মার্কেট, হাউজ খাস, লাজপত নগর, কাশ্মীরি গেট, সিলামপুর, শাহদরা ও রিঠালা। তবে অধিকাংশ স্টেশনে লাইনের মধ্যে সংযোগ বা ইন্টারচেঞ্জের সুবিধা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। শুধু নয়াদিল্লি স্টেশনে এ সুবিধা পাওয়া যাবে না।

এ বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে করা আবেদনগুলোর শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জনপরিবহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ না করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। আদালত পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক ব্যবস্থা নিতে এবং সাধারণ যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার নির্দেশনা দিয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে রেল চলাচলেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মোট ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন এবং ১৭৯টি লোকাল ট্রেন রয়েছে।

ট্রেন বাতিলের কারণে দিল্লির সঙ্গে গাজিয়াবাদ, মিরাট, পানিপথ ও কুরুক্ষেত্রের মতো এলাকার রেল যোগাযোগে প্রভাব পড়েছে। নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে যাত্রার আগে যাত্রীদের নিজ নিজ ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নিতে বলা হয়েছে। তবে পুরনো দিল্লি, আনন্দ বিহার ও দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন চালু রয়েছে।

এ ছাড়া নমো ভারত রেলের সরাই কালে খান ও নিউ অশোক নগর স্টেশন ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে।

দিল্লি ট্রাফিক পুলিশও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রায় ৩০টি সড়ক চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ১০ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে যন্তর মন্তর, কনট প্লেস, মান্ডি হাউস, প্যাটেল চক, অশোকা রোড, জনপথ, লোধি রোড ও ধৌলা কুয়ো।

দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দীনেশ কুমার গুপ্ত জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী যান চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হবে। তবে কোনো সড়ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বা যান চলাচল সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যাদের জরুরি প্রয়োজন নেই, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাইরে বের হতে হলে হাতে অতিরিক্ত সময় রাখা এবং ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে রেলস্টেশন, আন্তরাজ্য বাস টার্মিনাল ও বিমানবন্দরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার অংশ হিসেবে ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির সব খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেসের নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনও ১০ অক্টোবর দোকান, অফিস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ভাগীরথ প্যালেস ও চাঁদনি চক বাজার কর্তৃপক্ষও ওই দিন বাজার বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

সম্ভাব্য যানজটের কথা বিবেচনায় দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আগেভাগে যাত্রার পরিকল্পনা করতে এবং বিমানবন্দরে পৌঁছানোর জন্য স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় হাতে রাখতে পরামর্শ দিয়েছে।

দিল্লির পাশাপাশি প্রতিবেশী উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজধানীসংলগ্ন মিরাট ও বেরেলি জোনের জেলাগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। দিল্লিগামী সড়কগুলোতে যানবাহন পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লখনউ, আগ্রা, মিরাট, বেরেলি, গাজিয়াবাদ, নয়ডা, প্রয়াগরাজ ও বারাণসীতে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচির ওপরও নজর রাখছে প্রশাসন। গৌতম বুদ্ধ নগর জেলায় ১০ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। বিক্ষোভ, উৎসব ও বিভিন্ন জনসমাবেশের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে দিল্লি ও লখনউয়ের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনেও। ১০ অক্টোবরের লখনউ মেল ও নয়াদিল্লি-লখনউ এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১ অক্টোবরের লখনউ-নয়াদিল্লি গোমতী এক্সপ্রেসও বাতিলের তালিকায় রয়েছে।

বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া হলেও সমর্থকেরা জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

উত্তপ্ত দিল্লিতে ২৫ হাজার পুলিশ, বন্ধ ইন্টারনেট-রেলসেবা

আপডেট সময় ১১:০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

 

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। শহরজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং মধ্য দিল্লির নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা। পাশাপাশি, নিরাপত্তাজনিত কারণে ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের অনুমতি না দিলেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা রাজধানীতে জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। এ কারণে দিল্লির সীমান্ত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরও পড়ুন  ভারতের ওড়িশা সীমান্তে গোলাগুলিতে ১৪ জন নিহত

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত থেকেই নিরাপত্তার প্রস্তুতি জোরদার করা হয়। যন্তর মন্তরের আশপাশে বসানো হয়েছে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড। মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পাশাপাশি রেল ও মেট্রো চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুমতি না নেওয়া, অতীতে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার অভিজ্ঞতা এবং বড় জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা ও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিক্ষোভের আগে রাজ্যগুলোকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন ৯ অক্টোবর দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

চিঠিতে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, অনুমতি না পেলেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোকে গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্তে নজরদারির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ এবং দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে। নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির সীমান্ত এলাকায় যানবাহনে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিক্ষোভের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোকজনকে সংগঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা জানতে অনলাইন পোস্ট ও বার্তা পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন। এ কাজে ২০০-র বেশি কনটেন্ট নির্মাতাকে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ও দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরকে ঘিরে প্রায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-র বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কথা রয়েছে।

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সড়কগুলোতে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টির বেশি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশকে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১২০টির বেশি কোম্পানি মোতায়েনের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

স্পর্শকাতর এলাকায় লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া জমায়েত, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি এবং সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি যাচাই করতে বিভিন্ন স্থানে মহড়াও চালানো হয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য ১২টি আটককেন্দ্র প্রস্তুত করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশ সদস্যদের সংযত ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উসকানির মুখেও যাতে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখান, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউসগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আবাসন প্রতিষ্ঠান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ঘর ভাড়া দেওয়া সংস্থা এবং সম্পত্তির মালিকদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে নয়াদিল্লি জেলার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য বডি ক্যামেরার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করতে প্রায় ১০০ জন আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফারকে কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।

জনপথ ও করতব্য পথের সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার কথা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল এ নির্দেশ জারি করে। এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন আইডিয়া ও এমটিএনএলকে নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনও নিরাপত্তার কারণে চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রথমে ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ৪৫টি স্টেশনে সীমিত করা হয়। ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এসব স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।

বিধিনিষেধের আওতায় থাকা স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, নয়াদিল্লি, মান্ডি হাউস, আইটিও, খান মার্কেট, হাউজ খাস, লাজপত নগর, কাশ্মীরি গেট, সিলামপুর, শাহদরা ও রিঠালা। তবে অধিকাংশ স্টেশনে লাইনের মধ্যে সংযোগ বা ইন্টারচেঞ্জের সুবিধা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। শুধু নয়াদিল্লি স্টেশনে এ সুবিধা পাওয়া যাবে না।

এ বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে করা আবেদনগুলোর শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জনপরিবহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ না করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। আদালত পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক ব্যবস্থা নিতে এবং সাধারণ যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার নির্দেশনা দিয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে রেল চলাচলেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মোট ২৫৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন এবং ১৭৯টি লোকাল ট্রেন রয়েছে।

ট্রেন বাতিলের কারণে দিল্লির সঙ্গে গাজিয়াবাদ, মিরাট, পানিপথ ও কুরুক্ষেত্রের মতো এলাকার রেল যোগাযোগে প্রভাব পড়েছে। নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে যাত্রার আগে যাত্রীদের নিজ নিজ ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নিতে বলা হয়েছে। তবে পুরনো দিল্লি, আনন্দ বিহার ও দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন চালু রয়েছে।

এ ছাড়া নমো ভারত রেলের সরাই কালে খান ও নিউ অশোক নগর স্টেশন ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে।

দিল্লি ট্রাফিক পুলিশও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রায় ৩০টি সড়ক চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ১০ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে যন্তর মন্তর, কনট প্লেস, মান্ডি হাউস, প্যাটেল চক, অশোকা রোড, জনপথ, লোধি রোড ও ধৌলা কুয়ো।

দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দীনেশ কুমার গুপ্ত জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী যান চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হবে। তবে কোনো সড়ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বা যান চলাচল সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যাদের জরুরি প্রয়োজন নেই, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাইরে বের হতে হলে হাতে অতিরিক্ত সময় রাখা এবং ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে রেলস্টেশন, আন্তরাজ্য বাস টার্মিনাল ও বিমানবন্দরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার অংশ হিসেবে ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির সব খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেসের নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনও ১০ অক্টোবর দোকান, অফিস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ভাগীরথ প্যালেস ও চাঁদনি চক বাজার কর্তৃপক্ষও ওই দিন বাজার বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

সম্ভাব্য যানজটের কথা বিবেচনায় দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আগেভাগে যাত্রার পরিকল্পনা করতে এবং বিমানবন্দরে পৌঁছানোর জন্য স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় হাতে রাখতে পরামর্শ দিয়েছে।

দিল্লির পাশাপাশি প্রতিবেশী উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজধানীসংলগ্ন মিরাট ও বেরেলি জোনের জেলাগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। দিল্লিগামী সড়কগুলোতে যানবাহন পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লখনউ, আগ্রা, মিরাট, বেরেলি, গাজিয়াবাদ, নয়ডা, প্রয়াগরাজ ও বারাণসীতে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচির ওপরও নজর রাখছে প্রশাসন। গৌতম বুদ্ধ নগর জেলায় ১০ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। বিক্ষোভ, উৎসব ও বিভিন্ন জনসমাবেশের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে দিল্লি ও লখনউয়ের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনেও। ১০ অক্টোবরের লখনউ মেল ও নয়াদিল্লি-লখনউ এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১ অক্টোবরের লখনউ-নয়াদিল্লি গোমতী এক্সপ্রেসও বাতিলের তালিকায় রয়েছে।

বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া হলেও সমর্থকেরা জমায়েতের চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।