হিমবাহের বরফ গলছে ধারণার চেয়ে দ্রুত, সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ার শঙ্কা
- আপডেট সময় ০৬:০৭:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 17
অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহ বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও দ্রুত গলছে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমবাহটির বরফ গলার কারণে ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০ মিলিমিটার বা প্রায় ১ দশমিক ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বাড়তে পারে। আগের কিছু হিসাবের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার আর না বাড়লেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘কেয়ামতের হিমবাহ’ নামে পরিচিত থোয়াইটস পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত। প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই হিমবাহের আয়তন আফ্রিকার দেশ সেনেগালের প্রায় সমান। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের চেয়েও বড়।
আল জাজিরার ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষকেরা নতুন কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে হিমবাহটির বরফ গলার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের গবেষণাটি নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
থোয়াইটস হিমবাহ শুধু নিজেই বিশাল নয়, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার আরও বড় বরফস্তরকে ধরে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাইন আইল্যান্ডসহ আশপাশের কয়েকটি হিমবাহ মিলে এই বরফস্তরের জন্য একধরনের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।
থোয়াইটস দুর্বল হয়ে পড়লে বা এর বরফ দ্রুত গলতে থাকলে বৃহত্তর বরফস্তরের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায়। এতে উপকূলীয় শহর ও নিচু অঞ্চলগুলোতে প্লাবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, হিমবাহটি পুরোপুরি ধসে পড়লে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে, তা কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ঘটবে বলে তাঁরা নিশ্চিতভাবে পূর্বাভাস দিচ্ছেন না।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে থোয়াইটস হিমবাহের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত হিমবাহটি এক লাখ কোটি টনেরও বেশি বরফ হারিয়েছে। প্রতিবছর গড়ে আরও প্রায় ৫০০০ কোটি টন বরফ হারাচ্ছে এটি।
গবেষণায় হিমবাহটির বরফ গলার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উষ্ণ সমুদ্রের পানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উষ্ণ পানি হিমবাহের নিচে প্রবেশ করে বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। এতে হিমবাহের পুরুত্ব কমছে এবং এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তরেও।
২০১৯ সালে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির এক গবেষণায় থোয়াইটস হিমবাহের নিচে বিশাল একটি পানির গহ্বরের সন্ধান পাওয়া যায়। এর আয়তন ম্যানহাটনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান। গবেষকদের ধারণা, এই গহ্বর হিমবাহটির বরফ দ্রুত পাতলা হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
নতুন গবেষণায় হিমবাহটির নিচের অংশে সমুদ্রের পানির প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে, যেখানে হিমবাহটি পাথুরে ভূমির ওপর থেকে সরে সমুদ্রের ওপর ভাসমান বরফস্তরে রূপ নেয়, সেই সংযোগস্থলে বরফ গলার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, জোয়ার-ভাটার প্রভাবে সমুদ্রের পানি বরফকে ওঠানামা করায়। এতে উষ্ণ পানি বরফস্তরের আরও গভীরে পৌঁছে তীব্রভাবে বরফ গলাতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় থোয়াইটস হিমবাহের নিচের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে ঠিক কতটা বরফ গলবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়বে, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বিজ্ঞানীদের পৃথক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্রের পানি ঠান্ডা হওয়ার চরম পরিস্থিতিতেও থোয়াইটস হিমবাহের বরফ গলা অন্তত আরও ১৫০ বছর অব্যাহত থাকতে পারে। ওই গবেষণাটি জুলাইয়ে জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, হিমবাহটির দ্রুত বরফ হারানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়বে।






















