ঢাকা ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

গ্রামীণ ঐতিহ্যের পসরা সাজে যে বাজারে

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৩:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / 22

ছবি সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা বাজারে সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় রোববারের দৃশ্য আলাদা। সাপ্তাহিক হাটকে ঘিরে সকাল থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম। গরু-ছাগলের বেচাকেনা, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট, বাঁশ-বেতের তৈরি গৃহস্থালির সামগ্রী এবং নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো বাজার এলাকা। গ্রামীণ জীবনের পরিচিত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে এখনো টিকে আছে পুরোনো হাটের ঐতিহ্য।

দেশের অনেক গ্রামীণ বাজার সময়ের সঙ্গে আধুনিক রূপ নিলেও টেংরা বাজারে এখনো দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী হাটের নানা বৈশিষ্ট্য। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই বাজার স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কেনাবেচার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

বাজারের অন্যতম আকর্ষণ বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন গৃহস্থালির সামগ্রী। হাটের নির্দিষ্ট অংশে সাজিয়ে রাখা হয় টুকরি, খলই, দুছইন, হুপা, ঝাঁকা, কুলা, চালুন, বেতের মাথাল ও সেঁউতিসহ নানা পণ্য। পাশাপাশি পাওয়া যায় শীতলপাটি ও কেয়াপাতার তৈরি পাটি। গ্রামীণ জীবনে এসব উপকরণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ব্যবহারিক প্রয়োজন, নির্মাণশৈলী ও স্থায়িত্বের কারণে এখনো পণ্যগুলোর ক্রেতা রয়েছে।
শুধু বাঁশ-বেতের সামগ্রী নয়, বাজারজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকান। কোথাও বিক্রি হয় দা, কোদাল, খুন্তিসহ লোহার তৈরি সরঞ্জাম, আবার কোথাও সাজানো থাকে মৌসুমি শাকসবজি। খাসিয়া পান, বাংলা পান ও সুপারি বিক্রির জন্যও রয়েছে আলাদা জায়গা। গবাদিপশুর খাবার এবং পরিবারের দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় নানা পণ্যও পাওয়া যায় এই হাটে।

আরও পড়ুন  গ্রামীণ অর্থনীতিকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনতে হবে: অর্থমন্ত্রী

রোববার বাজারের পশুর অংশেও থাকে ব্যস্ততা। একদিকে খুঁটিতে বাঁধা গরুর সারি, অন্যদিকে ছাগল কেনাবেচার আয়োজন। সড়কের পূর্ব পাশে বসে হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। ক্রেতারা বিভিন্ন বিক্রেতার কাছে গিয়ে পণ্যের মান ও দাম যাচাই করেন। দরদামের পর পছন্দসই পশু কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে বাড়ি ফেরেন অনেকে।

টেংরা বাজার নামে পরিচিত এই এলাকার ভেতরে ভটের বাজার ও বাগিচা বাজার নামে আরও দুটি অংশ রয়েছে। প্রতিদিনই স্থায়ী দোকানগুলোতে বেচাকেনা হয়। তবে রোববারের সাপ্তাহিক হাটে বাজারের পরিসর ও ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসায় জমে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল থেকে শুরু হওয়া লেনদেন অনেক সময় রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলে।

বাজারটির দীর্ঘ ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন প্রবীণ ব্যবসায়ী সুদর্শন মালাকার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুইশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হাট একসময় রাজনগর এলাকার অন্যতম বড় বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতি রোববার সকালে শুরু হওয়া বেচাকেনা অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত চলত। দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এটি ব্যবসার জায়গা হওয়ার পাশাপাশি অতীতের স্মৃতি বহনকারী একটি স্থান।

বাঁশ-বেতের সামগ্রী বিক্রি করছেন বীরেন্দ্র মালাকারও। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই বাজারে পণ্য বিক্রি করছেন। তাঁর মতে, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীই এখানে পাওয়া যায়। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি শহর থেকেও অনেকে এসব পণ্য কিনতে আসেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা পণ্য নিয়ে এসে বাজারে খুচরা দামে বিক্রি করেন।

টেংরা বাজারের বাঁশ-বেতের পণ্যগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় কারিগরদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এসব উপকরণ দিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরি করে আসছেন। ফলে বাজারে এসব পণ্যের বেচাকেনার পাশাপাশি গ্রামীণ কারুশিল্পের একটি পুরোনো ধারাও টিকে রয়েছে।

তবে বাজারের সবকিছু আগের মতো নেই। একসময় হাওর ও নদীর তাজা মাছের জন্য পরিচিত ছিল এখানকার মাছের বাজার। বর্তমানে সেখানে খামারে উৎপাদিত মাছের উপস্থিতিই বেশি। কুশিয়ারা নদী কিংবা হাকালুকি হাওরের মাছ এখন তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে মাছের বাজারের পরিচিত চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও কেনাকাটার ধরন বদলালেও টেংরা বাজারের সাপ্তাহিক হাটে এখনো দেখা যায় পুরোনো গ্রামীণ বাজারের বৈশিষ্ট্য। পশুর ডাক, মানুষের কোলাহল, পণ্যের পসরা আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম সব মিলিয়ে রোববারের হাট হয়ে ওঠে ব্যস্ত এক জনপদ।

স্থানীয়দের কাছে টেংরা বাজার তাই শুধু পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়; এটি এলাকার ইতিহাস, জীবিকা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত। দীর্ঘ সময় পেরিয়েও এখানে বাঁশ-বেতের সামগ্রী থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় পণ্যের সমাহার এবং সাপ্তাহিক হাটের আয়োজন অব্যাহত রয়েছে। এভাবেই রাজনগরের এই বাজারে গ্রামীণ বাংলার পুরোনো হাটের কিছু বৈশিষ্ট্য এখনো ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

গ্রামীণ ঐতিহ্যের পসরা সাজে যে বাজারে

আপডেট সময় ০৩:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা বাজারে সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় রোববারের দৃশ্য আলাদা। সাপ্তাহিক হাটকে ঘিরে সকাল থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম। গরু-ছাগলের বেচাকেনা, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট, বাঁশ-বেতের তৈরি গৃহস্থালির সামগ্রী এবং নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো বাজার এলাকা। গ্রামীণ জীবনের পরিচিত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে এখনো টিকে আছে পুরোনো হাটের ঐতিহ্য।

দেশের অনেক গ্রামীণ বাজার সময়ের সঙ্গে আধুনিক রূপ নিলেও টেংরা বাজারে এখনো দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী হাটের নানা বৈশিষ্ট্য। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই বাজার স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কেনাবেচার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

বাজারের অন্যতম আকর্ষণ বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন গৃহস্থালির সামগ্রী। হাটের নির্দিষ্ট অংশে সাজিয়ে রাখা হয় টুকরি, খলই, দুছইন, হুপা, ঝাঁকা, কুলা, চালুন, বেতের মাথাল ও সেঁউতিসহ নানা পণ্য। পাশাপাশি পাওয়া যায় শীতলপাটি ও কেয়াপাতার তৈরি পাটি। গ্রামীণ জীবনে এসব উপকরণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ব্যবহারিক প্রয়োজন, নির্মাণশৈলী ও স্থায়িত্বের কারণে এখনো পণ্যগুলোর ক্রেতা রয়েছে।
শুধু বাঁশ-বেতের সামগ্রী নয়, বাজারজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকান। কোথাও বিক্রি হয় দা, কোদাল, খুন্তিসহ লোহার তৈরি সরঞ্জাম, আবার কোথাও সাজানো থাকে মৌসুমি শাকসবজি। খাসিয়া পান, বাংলা পান ও সুপারি বিক্রির জন্যও রয়েছে আলাদা জায়গা। গবাদিপশুর খাবার এবং পরিবারের দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় নানা পণ্যও পাওয়া যায় এই হাটে।

আরও পড়ুন  বাজারে আসার দুই সপ্তাহের মধ্যেই আইফোনের নতুন মডেলে সমস্যা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা

রোববার বাজারের পশুর অংশেও থাকে ব্যস্ততা। একদিকে খুঁটিতে বাঁধা গরুর সারি, অন্যদিকে ছাগল কেনাবেচার আয়োজন। সড়কের পূর্ব পাশে বসে হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট। ক্রেতারা বিভিন্ন বিক্রেতার কাছে গিয়ে পণ্যের মান ও দাম যাচাই করেন। দরদামের পর পছন্দসই পশু কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে বাড়ি ফেরেন অনেকে।

টেংরা বাজার নামে পরিচিত এই এলাকার ভেতরে ভটের বাজার ও বাগিচা বাজার নামে আরও দুটি অংশ রয়েছে। প্রতিদিনই স্থায়ী দোকানগুলোতে বেচাকেনা হয়। তবে রোববারের সাপ্তাহিক হাটে বাজারের পরিসর ও ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসায় জমে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল থেকে শুরু হওয়া লেনদেন অনেক সময় রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলে।

বাজারটির দীর্ঘ ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন প্রবীণ ব্যবসায়ী সুদর্শন মালাকার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুইশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হাট একসময় রাজনগর এলাকার অন্যতম বড় বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতি রোববার সকালে শুরু হওয়া বেচাকেনা অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত চলত। দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এটি ব্যবসার জায়গা হওয়ার পাশাপাশি অতীতের স্মৃতি বহনকারী একটি স্থান।

বাঁশ-বেতের সামগ্রী বিক্রি করছেন বীরেন্দ্র মালাকারও। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই বাজারে পণ্য বিক্রি করছেন। তাঁর মতে, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীই এখানে পাওয়া যায়। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি শহর থেকেও অনেকে এসব পণ্য কিনতে আসেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা পণ্য নিয়ে এসে বাজারে খুচরা দামে বিক্রি করেন।

টেংরা বাজারের বাঁশ-বেতের পণ্যগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় কারিগরদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এসব উপকরণ দিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরি করে আসছেন। ফলে বাজারে এসব পণ্যের বেচাকেনার পাশাপাশি গ্রামীণ কারুশিল্পের একটি পুরোনো ধারাও টিকে রয়েছে।

তবে বাজারের সবকিছু আগের মতো নেই। একসময় হাওর ও নদীর তাজা মাছের জন্য পরিচিত ছিল এখানকার মাছের বাজার। বর্তমানে সেখানে খামারে উৎপাদিত মাছের উপস্থিতিই বেশি। কুশিয়ারা নদী কিংবা হাকালুকি হাওরের মাছ এখন তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে মাছের বাজারের পরিচিত চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও কেনাকাটার ধরন বদলালেও টেংরা বাজারের সাপ্তাহিক হাটে এখনো দেখা যায় পুরোনো গ্রামীণ বাজারের বৈশিষ্ট্য। পশুর ডাক, মানুষের কোলাহল, পণ্যের পসরা আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম সব মিলিয়ে রোববারের হাট হয়ে ওঠে ব্যস্ত এক জনপদ।

স্থানীয়দের কাছে টেংরা বাজার তাই শুধু পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়; এটি এলাকার ইতিহাস, জীবিকা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত। দীর্ঘ সময় পেরিয়েও এখানে বাঁশ-বেতের সামগ্রী থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় পণ্যের সমাহার এবং সাপ্তাহিক হাটের আয়োজন অব্যাহত রয়েছে। এভাবেই রাজনগরের এই বাজারে গ্রামীণ বাংলার পুরোনো হাটের কিছু বৈশিষ্ট্য এখনো ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।