ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

নোবেলজয়ীদের হাতে আঁকা পোর্ট্রেটের নেপথ্যে যে কারণ!

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৩:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 28

ছবি সংগৃহীত

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি একটি বিশেষ ধরনের পোর্ট্রেটও নজর কাড়ে। কালো রেখায় আঁকা মুখাবয়বের সঙ্গে থাকে সোনালি আভা। ডিজিটাল যুগে যেখানে মুহূর্তেই যেকোনো ব্যক্তির অসংখ্য ছবি পাওয়া সম্ভব, সেখানে নোবেলজয়ীদের জন্য কেন ব্যবহার করা হয় হাতে আঁকা এই বিশেষ প্রতিকৃতি—এর পেছনে রয়েছে বাস্তব প্রয়োজন, শিল্পভাবনা এবং দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল পরিচয়।

এই বিশেষ পোর্ট্রেটের গল্প শুরু হয় মূলত ছবি সংগ্রহের একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। ২০১২ সালে শিল্পী নিকলাস এলমেহেড নোবেল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর দেখতে পান, পুরস্কার ঘোষণার সময় অনেক বিজয়ীরই এমন মানসম্মত ও উপযোগী ছবি সহজে পাওয়া যায় না, যা দ্রুত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব।

নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর তার একটি ভালো ছবি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। আবার ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ছোট, অস্পষ্ট বা নিম্নমানের ছবি দিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খবর উপস্থাপন করা কঠিন। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবে এলমেহেড হাতে আঁকা পোর্ট্রেট তৈরি শুরু করেন।

আরও পড়ুন  হামের প্রকোপ বাড়ার পেছনে কারণ: চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

শুরুতে বিষয়টি ছিল নিছক প্রয়োজন মেটানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগই নোবেল পুরস্কারের অন্যতম পরিচিত ভিজ্যুয়াল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। পদার্থবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রের নোবেলজয়ী—সবার প্রতিকৃতিই একই ধরনের শিল্পভাষায় তৈরি করা হয়। এতে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকার পাশাপাশি সব ছবির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতাও তৈরি হয়। একই ধরনের পোর্ট্রেটের মাধ্যমে নোবেলজয়ীদের যেন একই ঐতিহাসিক সম্মানের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এলমেহেড প্রায় ১৪ বছর ধরে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার জন্য এসব প্রতিকৃতি তৈরি করছেন। ২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ায় আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করার সময় দ্রুত বিজ্ঞানীদের ভালো ছবি সংগ্রহের সমস্যাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই সমস্যা সমাধানে তিনি প্রথমে কালো মার্কার ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিকৃতি আঁকতেন।

২০১২ ও ২০১৩ সালের আঁকা পোর্ট্রেটগুলো সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর নোবেল কর্তৃপক্ষ এই কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি করতে তাকে বলে। পরে ২০১৭ সালের পর বর্তমান পরিচিত সোনালি ফয়েলযুক্ত স্টাইলটি যুক্ত হয়। ওই সময় নোবেল পুরস্কারের ভিজ্যুয়াল ব্র্যান্ডিংয়ে সোনালি রংকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

পোর্ট্রেটগুলোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো গাঢ় কালো রেখা। অতিরিক্ত রং কিংবা জটিল শেডিংয়ের পরিবর্তে মুখের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। এতে ছবিগুলো সহজে চেনা যায় এবং সংবাদ ওয়েবসাইটের ছোট থাম্বনেল থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের পাতাতেও সহজেই নজর কাড়ে। একই সঙ্গে নোবেল ঘোষণার খবরকে অন্যান্য সাধারণ ছবির ভিড় থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে এই পোর্ট্রেট।

তবে ছবির সোনালি আভা শুরু থেকেই ছিল না। ২০১৭ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ড পরিচয়ে পরিবর্তন আনে। নোবেল মেডেলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সোনালি রংকে গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তার পোর্ট্রেটগুলোতে আসল গোল্ড ফয়েল ব্যবহার শুরু করেন। কালো রেখার সঙ্গে ধাতব সোনার পাত যুক্ত হওয়ায় ছবিগুলো আরও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসব ছবি দেখে অনেকের মনে হতে পারে, বিশেষ কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করেই হয়তো পোর্ট্রেটগুলো তৈরি করা হয়। কিন্তু এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো হাতে আঁকা শিল্পকর্মের উপস্থিতি। ছবির রেখা তৈরিতে কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার ব্যবহার করা হয়। এরপর বিশেষ আঠার মাধ্যমে ধাতব সোনার পাত বসানো হয়।

অর্থাৎ দ্রুত ছবি সংগ্রহের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান হিসেবে যে উদ্যোগের শুরু, সময়ের সঙ্গে সেটিই নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই প্রতি বছর নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে কালো রেখা ও সোনালি পাতের পরিচিত পোর্ট্রেটও এখন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

নোবেলজয়ীদের হাতে আঁকা পোর্ট্রেটের নেপথ্যে যে কারণ!

আপডেট সময় ০৩:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি একটি বিশেষ ধরনের পোর্ট্রেটও নজর কাড়ে। কালো রেখায় আঁকা মুখাবয়বের সঙ্গে থাকে সোনালি আভা। ডিজিটাল যুগে যেখানে মুহূর্তেই যেকোনো ব্যক্তির অসংখ্য ছবি পাওয়া সম্ভব, সেখানে নোবেলজয়ীদের জন্য কেন ব্যবহার করা হয় হাতে আঁকা এই বিশেষ প্রতিকৃতি—এর পেছনে রয়েছে বাস্তব প্রয়োজন, শিল্পভাবনা এবং দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল পরিচয়।

এই বিশেষ পোর্ট্রেটের গল্প শুরু হয় মূলত ছবি সংগ্রহের একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। ২০১২ সালে শিল্পী নিকলাস এলমেহেড নোবেল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর দেখতে পান, পুরস্কার ঘোষণার সময় অনেক বিজয়ীরই এমন মানসম্মত ও উপযোগী ছবি সহজে পাওয়া যায় না, যা দ্রুত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব।

নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর তার একটি ভালো ছবি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। আবার ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ছোট, অস্পষ্ট বা নিম্নমানের ছবি দিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খবর উপস্থাপন করা কঠিন। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবে এলমেহেড হাতে আঁকা পোর্ট্রেট তৈরি শুরু করেন।

আরও পড়ুন  হামের প্রকোপ বাড়ার পেছনে কারণ: চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

শুরুতে বিষয়টি ছিল নিছক প্রয়োজন মেটানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগই নোবেল পুরস্কারের অন্যতম পরিচিত ভিজ্যুয়াল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। পদার্থবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রের নোবেলজয়ী—সবার প্রতিকৃতিই একই ধরনের শিল্পভাষায় তৈরি করা হয়। এতে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকার পাশাপাশি সব ছবির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতাও তৈরি হয়। একই ধরনের পোর্ট্রেটের মাধ্যমে নোবেলজয়ীদের যেন একই ঐতিহাসিক সম্মানের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এলমেহেড প্রায় ১৪ বছর ধরে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার জন্য এসব প্রতিকৃতি তৈরি করছেন। ২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ায় আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করার সময় দ্রুত বিজ্ঞানীদের ভালো ছবি সংগ্রহের সমস্যাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই সমস্যা সমাধানে তিনি প্রথমে কালো মার্কার ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিকৃতি আঁকতেন।

২০১২ ও ২০১৩ সালের আঁকা পোর্ট্রেটগুলো সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর নোবেল কর্তৃপক্ষ এই কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি করতে তাকে বলে। পরে ২০১৭ সালের পর বর্তমান পরিচিত সোনালি ফয়েলযুক্ত স্টাইলটি যুক্ত হয়। ওই সময় নোবেল পুরস্কারের ভিজ্যুয়াল ব্র্যান্ডিংয়ে সোনালি রংকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

পোর্ট্রেটগুলোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো গাঢ় কালো রেখা। অতিরিক্ত রং কিংবা জটিল শেডিংয়ের পরিবর্তে মুখের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। এতে ছবিগুলো সহজে চেনা যায় এবং সংবাদ ওয়েবসাইটের ছোট থাম্বনেল থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের পাতাতেও সহজেই নজর কাড়ে। একই সঙ্গে নোবেল ঘোষণার খবরকে অন্যান্য সাধারণ ছবির ভিড় থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে এই পোর্ট্রেট।

তবে ছবির সোনালি আভা শুরু থেকেই ছিল না। ২০১৭ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ড পরিচয়ে পরিবর্তন আনে। নোবেল মেডেলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সোনালি রংকে গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তার পোর্ট্রেটগুলোতে আসল গোল্ড ফয়েল ব্যবহার শুরু করেন। কালো রেখার সঙ্গে ধাতব সোনার পাত যুক্ত হওয়ায় ছবিগুলো আরও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসব ছবি দেখে অনেকের মনে হতে পারে, বিশেষ কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করেই হয়তো পোর্ট্রেটগুলো তৈরি করা হয়। কিন্তু এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো হাতে আঁকা শিল্পকর্মের উপস্থিতি। ছবির রেখা তৈরিতে কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার ব্যবহার করা হয়। এরপর বিশেষ আঠার মাধ্যমে ধাতব সোনার পাত বসানো হয়।

অর্থাৎ দ্রুত ছবি সংগ্রহের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান হিসেবে যে উদ্যোগের শুরু, সময়ের সঙ্গে সেটিই নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই প্রতি বছর নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে কালো রেখা ও সোনালি পাতের পরিচিত পোর্ট্রেটও এখন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।