ঢাকা ০৮:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুপার এল নিনোয় পরের ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৮:৪১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 0

ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে এক গবেষণায়।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত এই প্রাণহানি ঘটতে পারে।

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশগুলোকে রাখা হয়েছে। এসব দেশের অনেকগুলোই এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যসংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের মতো সমস্যার সঙ্গে লড়ছে।

আরও পড়ুন  ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১১ দিনে ১০৫ শিশু ভর্তি, প্রাণ হারালো ৩ জন

গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি তার পরেও থাকতে পারে। আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে বলেও জানান তিনি।

গ্রিনস্টোন বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে আগে থেকেই তুলনামূলক উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোর জন্য বেশি বিপজ্জনক। ধনী দেশগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত গরম মোকাবিলার সক্ষমতাও বেশি।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার প্রাক্কলন এবং তাপমাত্রার কারণে মানুষের মৃত্যুর ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর হার এবং ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর সময় সম্ভাব্য মৃত্যুর হারের তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করেছেন।

গ্রিনস্টোন ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধকল যাবে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট গরমে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে।

সম্ভাব্য প্রাণহানি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিনামূল্যে খাবার পানি সরবরাহ, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বাড়তি নজরদারির আওতায় আনা।

তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করার আগেই সরকারগুলো যাতে জরুরি অর্থ ছাড় ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখতে পারে, সে জন্য ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, প্রতিবেদনটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়, বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। ভারতের মতো দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা—দুটি ভিন্ন চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই উত্তপ্ত পৃথিবীর সঙ্গে চলতি বছরের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হওয়ায় চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম দাবদাহের দিন ৪৪ শতাংশ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, চলতি বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র থেকে ধারণা করা যায়, প্রায় ২০ বছর পর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর স্বাভাবিক আবহাওয়া কেমন হতে পারে। গবেষকদের মতে, বর্তমান এল নিনো ভবিষ্যতের জলবায়ুর একটি ‘আগাম বার্তা’ হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য এমন অঞ্চল চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি করছে, যেখানে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

সূত্র: এপি ও দ্য গার্ডিয়ান

নিউজটি শেয়ার করুন

সুপার এল নিনোয় পরের ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা

আপডেট সময় ০৮:৪১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে এক গবেষণায়।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত এই প্রাণহানি ঘটতে পারে।

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশগুলোকে রাখা হয়েছে। এসব দেশের অনেকগুলোই এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যসংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের মতো সমস্যার সঙ্গে লড়ছে।

আরও পড়ুন  অপ্রতিরোধ্য লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানল: নিয়ন্ত্রণহীন আগুনে ঘরহীন লক্ষাধিক মানুষ

গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি তার পরেও থাকতে পারে। আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে বলেও জানান তিনি।

গ্রিনস্টোন বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে আগে থেকেই তুলনামূলক উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোর জন্য বেশি বিপজ্জনক। ধনী দেশগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত গরম মোকাবিলার সক্ষমতাও বেশি।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার প্রাক্কলন এবং তাপমাত্রার কারণে মানুষের মৃত্যুর ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর হার এবং ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর সময় সম্ভাব্য মৃত্যুর হারের তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করেছেন।

গ্রিনস্টোন ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধকল যাবে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট গরমে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে।

সম্ভাব্য প্রাণহানি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিনামূল্যে খাবার পানি সরবরাহ, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বাড়তি নজরদারির আওতায় আনা।

তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করার আগেই সরকারগুলো যাতে জরুরি অর্থ ছাড় ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখতে পারে, সে জন্য ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, প্রতিবেদনটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়, বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। ভারতের মতো দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা—দুটি ভিন্ন চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই উত্তপ্ত পৃথিবীর সঙ্গে চলতি বছরের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হওয়ায় চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম দাবদাহের দিন ৪৪ শতাংশ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, চলতি বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র থেকে ধারণা করা যায়, প্রায় ২০ বছর পর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর স্বাভাবিক আবহাওয়া কেমন হতে পারে। গবেষকদের মতে, বর্তমান এল নিনো ভবিষ্যতের জলবায়ুর একটি ‘আগাম বার্তা’ হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য এমন অঞ্চল চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি করছে, যেখানে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

সূত্র: এপি ও দ্য গার্ডিয়ান