“মা, আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত” – জাবির অধ্যাপক
- আপডেট সময় ০২:২৭:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
- / 34
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে নিজের কার্যালয় থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সরিয়ে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। তিনি জানিয়েছেন, সেই ঘটনার পর বাড়ি ফিরে তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘মা, আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক শামীমা সুলতানা এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তার কার্যালয়ে শেখ হাসিনার ছবি না থাকার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার, গুলি, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার পর বিবেকের তাড়নায় তিনি প্রতিকৃতিটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
অধ্যাপক শামীমা সুলতানার ভাষ্য, এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও নৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে যে মূল্যবোধ ধারণ করে এসেছেন, সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই তিনি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এর আগে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ১৫ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাকে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এরপর অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতীকী প্রতিবাদে অংশ নেন এবং আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন বলে জানান।
অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, সংকটের সময় শিক্ষার্থীদের আশ্রয়ের জন্য তিনি নিজের কার্যালয় ও বিভাগের সভাপতির কক্ষ উন্মুক্ত রেখেছিলেন। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের যোগাযোগের সুবিধার্থে অফিসের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগও দিয়েছিলেন।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন আনে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি সরানোর সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া হয়নি। তার উপলব্ধি ছিল, যে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেছে, সেই সরকার নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে।
সিদ্ধান্তটির পরিণতি নিয়ে ভয় কাজ করেছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তরুণদের জীবনহানির ঘটনা দেখার পর তার কাছে ভয় নয়, দায়িত্ববোধই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
অধ্যাপক শামীমা সুলতানা জানান, প্রতিকৃতি সরানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে তিনি গালিগালাজপূর্ণ ফোনকল, হুমকিমূলক বার্তা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়েন বলেও উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিনই তার বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তাকে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নোটিশ পাননি। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তন এলে নতুন উপাচার্য ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
নিজের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, এ নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। তার মতে, এটি ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়; একজন শিক্ষক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদের দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র।



















