ঢাকা ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
নবাবগঞ্জে গ্রাম আদালত বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন কর্মশালা সুপার এল নিনোর শঙ্কা, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কী প্রভাব পড়তে পারে ব্যাটিং ব্যর্থতায় প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার আত্মীয়ের মরদেহ দেখতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল কাশেম মিয়ার বাজেটে প্রতিরক্ষা ও কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইওভারে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার, হাসপাতালে যুবকের মৃত্যু সাবেক ভূমিমন্ত্রীর পেজের এডমিন গ্রেফতার শিশু আয়াত হত্যা মামলায় আবিরের মৃত্যুদণ্ড মুসলিমদের বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করা হচ্ছে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

চুক্তিকে ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে দেখাচ্ছে ইরান

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
  • / 18

ছবি সংগৃহীত

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তিকে ইরান সরকার কোনো ধরনের ছাড় বা পিছু হটার ঘটনা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রতিরোধনীতি ও কূটনৈতিক তৎপরতার সফল ফল হিসেবে উপস্থাপন করছে। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও তেহরান এই চুক্তিকে জনগণের কাছে একটি অর্জন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে প্রচার করলেও দেশের ভেতরে এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একদিকে সরকারের সমর্থকেরা এটিকে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সফলতা হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে এটি বাস্তবতার চাপে নেওয়া একটি আপসমূলক পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন  ইউক্রেনজুড়ে রুশ হামলার তাণ্ডব, যুদ্ধবিরতিতে অনড় পুতিন

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিটিকে চূড়ান্ত সাফল্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, সমঝোতাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গালিবাফের সমর্থন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি কেবল মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি নন; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাবশালী অংশগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ মহলও চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং দেশটি এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

তবে এই ব্যাখ্যা সবাই গ্রহণ করছে না। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক কট্টরপন্থি সদস্য খসড়া চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পথ বলে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এমন সমঝোতা ইরানের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গত কয়েক মাস ধরে ইরানের কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও রাষ্ট্রপন্থি বিভিন্ন মহল যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বস্ত বলে আখ্যা দিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, আলোচনার আড়ালে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব সমালোচনামূলক কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে নীরব হয়ে পড়েছে, যা রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ইরানকে আলোচনার পথে এগোতে উৎসাহিত করেছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের প্রভাব, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে জনগণের বড় অংশের কাছে চুক্তির রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে কি না এবং নতুন সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পাবে কি না।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, চুক্তির শর্ত পূরণ হলে ইরানের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে তেহরান এই সমঝোতাকে বিদেশি বিনিয়োগ, পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা, আন্তর্জাতিক তদারকি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে।

এদিকে লেবানন ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ইরানের ওপর প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাধারণ ইরানিদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ কেউ এটিকে যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে সন্দিহান—চুক্তি আদৌ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে কি না এবং এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে কি না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতার সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নয়; বরং যুদ্ধের আশঙ্কা কমানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বাস্তব ফলাফলের ওপর।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

চুক্তিকে ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে দেখাচ্ছে ইরান

আপডেট সময় ১২:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তিকে ইরান সরকার কোনো ধরনের ছাড় বা পিছু হটার ঘটনা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রতিরোধনীতি ও কূটনৈতিক তৎপরতার সফল ফল হিসেবে উপস্থাপন করছে। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও তেহরান এই চুক্তিকে জনগণের কাছে একটি অর্জন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে প্রচার করলেও দেশের ভেতরে এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একদিকে সরকারের সমর্থকেরা এটিকে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সফলতা হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে এটি বাস্তবতার চাপে নেওয়া একটি আপসমূলক পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন  ইউক্রেনজুড়ে রুশ হামলার তাণ্ডব, যুদ্ধবিরতিতে অনড় পুতিন

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিটিকে চূড়ান্ত সাফল্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, সমঝোতাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গালিবাফের সমর্থন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি কেবল মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি নন; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাবশালী অংশগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ মহলও চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং দেশটি এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

তবে এই ব্যাখ্যা সবাই গ্রহণ করছে না। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক কট্টরপন্থি সদস্য খসড়া চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পথ বলে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এমন সমঝোতা ইরানের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গত কয়েক মাস ধরে ইরানের কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও রাষ্ট্রপন্থি বিভিন্ন মহল যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বস্ত বলে আখ্যা দিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, আলোচনার আড়ালে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব সমালোচনামূলক কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে নীরব হয়ে পড়েছে, যা রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ইরানকে আলোচনার পথে এগোতে উৎসাহিত করেছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের প্রভাব, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে জনগণের বড় অংশের কাছে চুক্তির রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে কি না এবং নতুন সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পাবে কি না।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, চুক্তির শর্ত পূরণ হলে ইরানের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে তেহরান এই সমঝোতাকে বিদেশি বিনিয়োগ, পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা, আন্তর্জাতিক তদারকি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে।

এদিকে লেবানন ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ইরানের ওপর প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাধারণ ইরানিদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ কেউ এটিকে যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে সন্দিহান—চুক্তি আদৌ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে কি না এবং এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে কি না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতার সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নয়; বরং যুদ্ধের আশঙ্কা কমানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বাস্তব ফলাফলের ওপর।