ধর্মীয় শিক্ষার্থী থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—এক দীর্ঘ পথচলার গল্প
- আপডেট সময় ১১:১২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
- / 30
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান আজ যে উচ্চতায়, তার কেন্দ্রে রয়েছেন এক ব্যক্তি—আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ধর্মীয় শিক্ষার্থী হিসেবে যাত্রা শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে পৌঁছানোর তাঁর জীবনপথ একাধারে সংগ্রাম, আদর্শ ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাস।
শৈশব:
ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের ধর্মীয় নগরী মাশহাদে-এ জন্মগ্রহণ করেন আলী খামেনি। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ ও সাদাসিধে জীবনযাপনের অনুসারী। পিতা ছিলেন শিয়া মাজহাবের একজন আলেম। ছোটবেলা থেকেই কুরআন তিলাওয়াত, আরবি ভাষা ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে তাঁর হাতেখড়ি হয়। পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবেশই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার মূল ভিত্তি।
শিক্ষা:
কোমের ধর্মীয় অঙ্গনে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য যান ইরানের বিখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র কোম-এ। সেখানে তিনি ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, তাফসির ও ইসলামি দর্শনে গভীর অধ্যয়ন করেন। এই সময় তিনি ইসলামি বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি -এর চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হন। খোমেনির ‘ভেলায়াতে ফকিহ’ তত্ত্ব তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পারস্য সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও তাঁর অনুরাগ ছিল। পরবর্তী সময়েও সাহিত্যচর্চা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে থাকে।
শাহবিরোধী আন্দোলন:
কারাবরণ ও নির্যাতন ১৯৬০-এর দশকে ইরানের শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-এর শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হন খামেনি। সরকারের নজরদারি, গ্রেপ্তার ও কারাবাস—সবই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। একাধিকবার তাঁকে আটক করা হয় এবং নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।
এই সংগ্রামী সময় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে তোলে এবং তাঁকে বিপ্লবী নেতৃত্বের কাতারে নিয়ে আসে।
ইসলামি বিপ্লব ও রাজনৈতিক উত্থান ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহের পতনের পর ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে খামেনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তিনি সংসদ সদস্য হন এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালে তাঁর ওপর একটি বোমা হামলা হয়, যাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁর ডান হাত আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়ে। একই বছর তিনি ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর প্রেসিডেন্সির সময় চলছিল দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ইরান–ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮)। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সর্বোচ্চ নেতা:
রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ আলী খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। এই পদটি ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি— সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক,বিচার বিভাগের প্রধান নিয়োগকারী,গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য নিয়োগকারী,রাষ্ট্রীয় নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাত ,
ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতিতে তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকার দিক থেকে খামেনির নেতৃত্বে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচক হিসেবে তিনি পরিচিত। তাঁর আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় ইস্যুতে পরিণত হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের নীতিও জোরদার হয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও ভাবমূর্তি খামেনি বিবাহিত এবং তাঁর কয়েকজন সন্তান রয়েছে। তিনি নিজেকে সাদাসিধে জীবনযাপনের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেন। সাহিত্য ও কবিতার প্রতি তাঁর অনুরাগ আলোচিত ছিলো।
ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মৃত্যু বরন করেন গতকাল (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) শনিবার ভোরে তাঁর দপ্তরে ‘দায়িত্ব পালনরত অবস্থায়’।
একজন সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষার্থী থেকে বিপ্লবী কর্মী, সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট এবং অবশেষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—আলী খামেনির জীবনপথ আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর নেতৃত্বে ইরান একদিকে যেমন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলো , অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিতর্ক ও নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছিলো।
ইরানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির আলোচনায় তাই আলী খামেনির নাম অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে ।

















