সহসাই কমছে না গ্যাস সংকট, সুযোগে বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলা ও কুকারের দাম
- আপডেট সময় ১১:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 75
দেশজুড়ে এলপিজি গ্যাসের সংকট কাটার কোনো তাৎক্ষণিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে গ্যাসের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে আমদানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত সংকট তৈরি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙনে। ফলে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেখানে মিলছে সেখানে দাম দিতে হচ্ছে দ্বিগুণের কাছাকাছি।
এলপিজির পাশাপাশি পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অনেক এলাকায় রান্না কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের চাহিদা বাড়ায় এসব পণ্যের দামও ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সরকার সংকট মোকাবিলায় এলপিজি আমদানির কোটা বাড়ানোসহ কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলসি খোলার পর নতুন গ্যাস দেশে পৌঁছাতে অন্তত ১৯ থেকে ৪৩ দিন সময় লাগবে। ফলে সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের হাতে। সরকারের অংশ মাত্র ২ শতাংশ। তিনি বলেন, ধর্মঘটসহ কয়েকটি কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছিল, তবে এখন সেগুলো প্রত্যাহার হয়েছে। আশা করা হচ্ছে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক মাস ধরে এলপিজি সংকটে ভুগছেন গ্রাহকেরা। শীত মৌসুমে যেখানে এলপিজির মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন, সেখানে গত ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টন। তবু বাজারে সিলিন্ডারের সংকট কাটেনি। অনেক এলাকায় এলপিজির দোকান বন্ধ, আবার কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না।
ভোক্তাদের অভিযোগ, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই বাজারে সংকট দেখা দেয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও তীব্র হয়। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে থাকে। যদিও জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুরুতে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়, বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
শনিরআখড়ার বাসিন্দা সজল ভূঞান বলেন, আগে সকালে অল্প সময়ের জন্য হলেও লাইনের গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে একেবারেই গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে আত্মীয়ের বাসা থেকে রান্না করা খাবার এনে চলতে হচ্ছে।
এলপিজি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল মাওলা জানান, দেশে প্রায় এক হাজার অটো গ্যাস স্টেশন রয়েছে। এলপিজিতে রূপান্তরিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালক ও মালিকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক যানবাহন এখন বাধ্য হয়ে তরল জ্বালানিতে চলছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামা, জাহাজ সংকট ও কিছু কার্গোর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানিতে সমস্যা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির সীমা দীর্ঘদিন ধরে অপর্যাপ্ত ছিল। যদিও সম্প্রতি সরকার কিছু কোম্পানির আমদানি কোটা বাড়ানো এবং এলপিজিকে গ্রিন পণ্য হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ওমেরা এলপিজির পরিচালক আজম জে. চৌধুরী বলেন, সরবরাহে ঘাটতি না থাকলে বাজারে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কঠিন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলসির পণ্য দেশে না আসায় সংকট তৈরি হয়েছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, সরকার সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নতুন করে এলসি খোলার পর সৌদি আরব বা কাতার থেকে গ্যাস আসতে সময় লাগবে অন্তত ১৯ দিন, আর যুক্তরাষ্ট্র বা আর্জেন্টিনা থেকে এলে লাগবে ৩৪ থেকে ৪৩ দিন। অর্থাৎ সংকট শিগগির কাটছে না।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে জনস্বার্থবিরোধী ও অমানবিক বলে মন্তব্য করেন।

























