ঢাকা ০৮:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাওনা টাকা চাওয়ায় বন্ধুকে মেরে মাটিচাপা

খবরের কথা ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৭:০৭:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 35

ছবি সংগৃহীত

 

তিন লাখ টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের পর নিখোঁজ ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম রনীর লাশ রাজধানীর লালবাগের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দীর্ঘ তল্লাশির পর লাশটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ওয়াসিমকে হত্যা করে লাশ গোপন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৯ নম্বর বি সি দাস স্ট্রিটের ওই ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ পাওয়া যায়। এ সময় পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছিলেন।

আরও পড়ুন  লালবাগে ভবন থেকে পড়ে অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু

পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতের স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ ওয়াসিম রনী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যে ভবনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় আটক মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর ইমিটেশন জুয়েলারির পাইকারি কারখানা ছিল বলে জানান ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেন।

মুরাদ হোসেন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওয়াসিমের যোগাযোগ হয়। ওই দিন তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল বলে তারা জানতে পারেন। ওয়াসিমের সঙ্গে তার বড় বোনের স্বামীর ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়টিও তিনি জানতেন বলে জানান মুরাদ।

তার ভাষ্য, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকে ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজ শুরু করেন এবং ওয়াসিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ওয়াসিমের বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান। শুধু ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন এবং পরে চলে গেছেন বলে জানান তিনি।

ওয়াসিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা লালবাগ থানায় যান এবং তার নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্নভাবে তার সন্ধান চালায়।

মুরাদ হোসেনের দাবি, একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে ওয়াসিমের লাশ একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করা হয়।

মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ গোপন করতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, পাওনা তিন লাখ টাকা নিয়ে বিরোধের জেরেই ওয়াসিমকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। পরে ওয়াসিমকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বসবাস করতেন শেখ ওয়াসিম রনী।

এদিকে অভিযুক্ত মাসুমের বোনের জামাইয়ের দাবি, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিম রনীর কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। পরে তিন লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসিমের সঙ্গে মাসুমের বিরোধ চলছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুসি মারেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান বলেও তার ভাষ্য।

পুলিশের কাছ থেকে পরে জানতে পেরেছেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ার পর তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমকে বাসায় না পেয়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ওয়াসিমের স্ত্রীর ভাই মো. মুরাদ হোসেনের মোবাইল ফোন থেকে তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তখন মাসুম জানান, তিনি ইস্কাটন এলাকায় আছেন। সেখানকার কাজ শেষ করে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও জানান তিনি।

তবে দীর্ঘ সময়েও মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা না করায় ওয়াসিমের স্বজনরা তার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যেতে থাকেন। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিমের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরির আবেদন করা হয়। জিডির নম্বর ৪২৬, তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

এজাহারে বলা হয়েছে, পরে থানা পুলিশের সহায়তায় ওয়াসিমের সন্ধান চালানো হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ মাসুমকে সন্দেহ করে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মাসুমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগ থানাধীন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার পাঁচতলা ভবনে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ভবনের নিচতলার খালি জায়গা থেকে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে লালবাগ থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এজাহার অনুযায়ী, মাসুম ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। তিন মাসের মধ্যে ওই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য ওয়াসিম ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে মাসুম পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওয়াসিমকে হত্যা করে লাশ গুম করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পাওনা তিন লাখ টাকা পরিশোধ না করার বিরোধ থেকেই এ ঘটনা ঘটে।

তবে এজাহারের আরেক অংশে ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে ভোর ৪টা ৫ মিনিটের মধ্যে লালবাগ থানার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের ৮৭ নম্বর ফ্ল্যাট, ৪ নম্বর ভবনের সামনে খোলা মাঠে মারধর করে হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, একই এজাহারে বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার নিচতলার খালি জায়গা থেকে হাত-পা বাঁধা ও মুখে পলিথিন প্যাঁচানো অবস্থায় ওয়াসিমের লাশ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। ফলে এজাহারে ঘটনাস্থল, সময় ও ঘটনার বিবরণে অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।

লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ৮ সেপ্টেম্বর রনী নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, হত্যার কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পাওনা টাকা ও আর্থিক লেনদেনকে ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে ডিসি তালেবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে মাসুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত রনীর সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য রনী তার বাসায় গেলে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এরপর ওয়াসিমকে ওই অফিসের পেছনের একটি সরু গলিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সঠিক সময় ও ধরন, ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা এবং লাশ গোপনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হওয়ার পর এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

পাওনা টাকা চাওয়ায় বন্ধুকে মেরে মাটিচাপা

আপডেট সময় ০৭:০৭:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

তিন লাখ টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের পর নিখোঁজ ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম রনীর লাশ রাজধানীর লালবাগের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দীর্ঘ তল্লাশির পর লাশটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ওয়াসিমকে হত্যা করে লাশ গোপন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৯ নম্বর বি সি দাস স্ট্রিটের ওই ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ পাওয়া যায়। এ সময় পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছিলেন।

আরও পড়ুন  আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হলে প্রতিটি যুদ্ধেই বিজয় অর্জন করা সম্ভব: প্রধান উপদেষ্টা

পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতের স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ ওয়াসিম রনী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যে ভবনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় আটক মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর ইমিটেশন জুয়েলারির পাইকারি কারখানা ছিল বলে জানান ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেন।

মুরাদ হোসেন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওয়াসিমের যোগাযোগ হয়। ওই দিন তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল বলে তারা জানতে পারেন। ওয়াসিমের সঙ্গে তার বড় বোনের স্বামীর ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়টিও তিনি জানতেন বলে জানান মুরাদ।

তার ভাষ্য, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকে ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজ শুরু করেন এবং ওয়াসিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ওয়াসিমের বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান। শুধু ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন এবং পরে চলে গেছেন বলে জানান তিনি।

ওয়াসিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা লালবাগ থানায় যান এবং তার নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্নভাবে তার সন্ধান চালায়।

মুরাদ হোসেনের দাবি, একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে ওয়াসিমের লাশ একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করা হয়।

মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ গোপন করতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, পাওনা তিন লাখ টাকা নিয়ে বিরোধের জেরেই ওয়াসিমকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। পরে ওয়াসিমকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বসবাস করতেন শেখ ওয়াসিম রনী।

এদিকে অভিযুক্ত মাসুমের বোনের জামাইয়ের দাবি, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিম রনীর কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। পরে তিন লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসিমের সঙ্গে মাসুমের বিরোধ চলছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুসি মারেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান বলেও তার ভাষ্য।

পুলিশের কাছ থেকে পরে জানতে পেরেছেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ার পর তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমকে বাসায় না পেয়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ওয়াসিমের স্ত্রীর ভাই মো. মুরাদ হোসেনের মোবাইল ফোন থেকে তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তখন মাসুম জানান, তিনি ইস্কাটন এলাকায় আছেন। সেখানকার কাজ শেষ করে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও জানান তিনি।

তবে দীর্ঘ সময়েও মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা না করায় ওয়াসিমের স্বজনরা তার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যেতে থাকেন। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিমের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরির আবেদন করা হয়। জিডির নম্বর ৪২৬, তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

এজাহারে বলা হয়েছে, পরে থানা পুলিশের সহায়তায় ওয়াসিমের সন্ধান চালানো হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ মাসুমকে সন্দেহ করে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মাসুমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগ থানাধীন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার পাঁচতলা ভবনে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ভবনের নিচতলার খালি জায়গা থেকে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে লালবাগ থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এজাহার অনুযায়ী, মাসুম ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। তিন মাসের মধ্যে ওই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য ওয়াসিম ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে মাসুম পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওয়াসিমকে হত্যা করে লাশ গুম করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পাওনা তিন লাখ টাকা পরিশোধ না করার বিরোধ থেকেই এ ঘটনা ঘটে।

তবে এজাহারের আরেক অংশে ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে ভোর ৪টা ৫ মিনিটের মধ্যে লালবাগ থানার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের ৮৭ নম্বর ফ্ল্যাট, ৪ নম্বর ভবনের সামনে খোলা মাঠে মারধর করে হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, একই এজাহারে বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার নিচতলার খালি জায়গা থেকে হাত-পা বাঁধা ও মুখে পলিথিন প্যাঁচানো অবস্থায় ওয়াসিমের লাশ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। ফলে এজাহারে ঘটনাস্থল, সময় ও ঘটনার বিবরণে অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।

লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ৮ সেপ্টেম্বর রনী নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, হত্যার কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পাওনা টাকা ও আর্থিক লেনদেনকে ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে ডিসি তালেবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে মাসুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত রনীর সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য রনী তার বাসায় গেলে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এরপর ওয়াসিমকে ওই অফিসের পেছনের একটি সরু গলিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সঠিক সময় ও ধরন, ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা এবং লাশ গোপনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হওয়ার পর এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।