নিঃশ্বাস ও শরীরের উষ্ণতা: ঘুটঘুটে অন্ধকারেও যেভাবে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায় মশা
- আপডেট সময় ১২:০৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
- / 18
রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো দৃশ্যমান আলো না থাকলেও মশা কীভাবে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মানুষকে খুঁজে বের করে, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, বরং মশা মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করতে তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংবেদনশীল প্রাকৃতিক সংকেত ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকদের যৌথ এক গবেষণায় এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি উন্মোচিত হয়েছে।
গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, মশার কাছে মানুষের অবস্থান শনাক্তের প্রথম ও প্রধান সংকেত হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড। মানুষ যখন শ্বাস ছাড়ে, তখন বাতাসে মিশে যাওয়া এই গ্যাসের সামান্যতম পরিবর্তনও মশা দূর থেকে শনাক্ত করতে পারে। এই গ্যাস অনুসরণ করেই তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়। তবে শুধু গ্যাসই নয়, মশার রয়েছে ইনফ্রারেড সেন্সিংয়ের মতো বিশেষ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তারা মানুষের শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা বা তাপ অনুভব করতে পারে। ফলে অন্ধকারে চোখ দিয়ে না দেখলেও তারা তাপের উৎস দেখে বুঝতে পারে কোথায় মানুষ ঘুমিয়ে আছে।
মানুষের শরীরের গন্ধ মশার তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা বলছেন, মানুষের ত্বক থেকে নিঃসৃত ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো মশার কাছে এক ধরনের ‘রাসায়নিক পরিচয়’ হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তিভেদে এই রাসায়নিকের ঘনত্ব ও অনুপাত ভিন্ন হওয়ায় মশা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। এই কারণেই একই ঘরে থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায় এবং কেউ কেউ তুলনামূলক অক্ষত থাকেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মশারা দলবদ্ধভাবে শিকার খোঁজে—এমন প্রচলিত ধারণাটি সঠিক নয়। প্রতিটি মশা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার নিজস্ব সেন্সর ব্যবহার করে মানুষের শরীর থেকে আসা সংকেতগুলো শনাক্ত করে। তাদের শরীরে থাকা বিশেষ জৈবিক ঘড়ি বা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ মূলত রাতের বেলাতেই তাদের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় করে তোলে। রাতের শান্ত পরিবেশ ও মানুষের শরীরের স্থিরতা তাদের জন্য শিকার ধরাকে আরও সহজ করে দেয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, নিঃশ্বাসের গ্যাস, শরীরের উষ্ণতা এবং ত্বকের রাসায়নিক গন্ধের এই ত্রিবিধ সংকেত মশার জন্য একটি অদৃশ্য মানচিত্র তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক প্রযুক্তির কারণেই অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, মানুষের শরীরের প্রতিটি অংশ মশার কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বর্তমান এই গবেষণা মশা নিয়ন্ত্রণ ও মশকবাহিত রোগ প্রতিরোধে নতুন পথ দেখাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

























